এখনো প্রিয় দেশে চাঁদাবাজ ও মামলাবাজদের ভয়ে নিরীহ মানুষ অস্থির বলে মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দুর্নীতিতে দেশ ছেয়ে গেছে। এখনও মায়েরা ঘরের মধ্যে নিরাপদ নয়। ঘর থেকে বের হলে এবং কর্মস্থলেও নিরাপদ নয়। মানুষ কি এই বাংলাদেশ চেয়েছেন? আমি এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য। আমার যে ভাই জীবন দিয়েছেন- আমি বিশ্বাস করি, এমন বাংলাদেশের চিত্র দেখলে তিনি হয়তো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেন না। জীবন বাজি রেখে, জীবন দিয়ে যারা আমাদেরকে ঋণী করে গেলেন তাঁদের প্রতি এই দেশ, এই জাতি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ কি সম্মান দেখালো? শহীদদের স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায় ও সাম্যের বাংলাদেশ গড়বে। মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। সন্তানরা সুশিক্ষা পাবে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে শনিবার সকালে হবিগঞ্জ নিউ ফিল্ড মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা তারা তাঁদের স্বাস্থ্যের পরিচর্যার সমস্ত অধিকার ভোগ করবে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সমাজে নিরাপত্তা থাকবে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। আসলে কিছুই হলো না। এর জন্য কারা দায়ী? যারা দফায় দফায় দেশ পরিচালনা করার সুযোগ পেয়েছে তারা যদি ভালো কিছু করে থাকে তার জন্য এবং অপকর্ম যদি করে থাকে তার জন্যও তারাই দায়ী।
তিনি আরও বলেন, কেউ একেবারে ভালো কিছু করেন নাই- এ কথা আমি বলছি না। কিন্তু এ দেশ সবুজ ছায়ায় ঘেরা, উর্বর একটি দেশ। এ দেশে অনেক সম্পদ আছে। কিন্তু এ দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না কেন? শুধু অসৎ নেতৃত্বের কারণে এ দেশের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আপনারা জানেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে কমপক্ষে ২৮ লক্ষ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হয়েছে। এ টাকাগুলো কার? এ টাকাগুলো ১৮ কোটি মানুষের। রাস্তায় যিনি ভিক্ষা করেন এই টাকার অংশে তিনিও আছেন। আজকের জন্ম নেওয়া শিশুরও অংশ আছে। রাষ্ট্রের আয়ের তিনটি খাত- একটি হলো ট্যাক্স, আর একটি বিদেশি অনুদান, আর বিদেশি সাহায্য। এই তিনটি মিলে রাষ্ট্রের তহবিল গঠন হয়। এই তিনটিতে সমস্ত মানুষ অংশীদার। তারা জনগণের টাকা চুরি করে বড়লোক হয়েছে। তারা পরিবারসহ টাকা বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
জামায়াত আমীর বলেন, আমরা দুর্নীতিমুক্ত একটা বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়ে ময়দানে নেমেছি ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দেশ পরিচালনার সুযোগ দিলে আমরা চাঁদাবাজদের হাত বন্ধ করে দেব। চাঁদাবাজরা আর চাঁদাবাজি করার সাহস পাবে না। রাজধানীর কিছু কিছু জায়গায় ভিক্ষুক ভিক্ষা করতে বসে- তাদেরও চাঁদা দিয়ে ভিক্ষা করতে হয়। রাজনীতি আমাদের পেশা নয়। যারা রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে তারা দুর্নীতি, চাঁদাবাজি করে। এরা আমাদের মা-বোনদের ইজ্জত রাখতে দেয় না।
তিনি আরও বলেন, কিছু রাজনৈতিক বন্ধুরা আছেন- যারা মা-বোনদের কাপড় খুলে ফেলতে চান। তাঁদের কি মা-বোন নেই? আপনারা নিজেদের মা-বোনদেরকে সম্মান করা শিখুন। যদি আপনাদের মা-বোনদেরকে সম্মান করা শিখে থাকেন- তাহলে এ দেশের ৯ কোটি মা-বোনদেরকে আপনারা সম্মান করতে পারবেন। আমরা এই ভাই-বন্ধুদেরকে বলব, প্লিজ এই অপকর্ম থেকে বিরত থাকুন। যদি আপনারা বিরত না থাকেন, ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন, গায়ে হাত তোলেন, কাপড় ধরে টান দেন তাহলে আমরা বলে দিচ্ছি- অনেক সহ্য করেছি। প্রয়োজনে জীবন দেব কিন্তু আর কাউকে মায়েদের ইজ্জত কেড়ে নিতে দেব না ইনশাআল্লাহ। তিনি ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বলেন, আমরা ন্যায়বিচার কায়েম করার পক্ষে, ন্যায়বিচার কায়েম করতে চাই। একজন সাধারণ মানুষ অপরাধ করলে যে আইনের মাধ্যমে শাস্তি হবে, রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরাও যদি সেই অপরাধ করে তাঁদের সে আইনেই বিচার হবে। আইন কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলবে না। আইন সকলের জন্য সমান হবে। বিচার আর টাকার বিনিময়ে বিক্রি হবে না ইনশাআল্লাহ।
তিনি নির্বাচিত প্রার্থীদের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা সম্পর্কে বলেন, আমাদের অঙ্গীকার স্পষ্ট। আল্লাহ তায়ালার মেহেরবানিতে আপনাদের দোয়া ও ভালোবাসা পেয়ে আমাদের যারা নির্বাচিত হবেন তারা প্রতি বছর একবার তাঁদের আয়-ব্যয়ের হিসাব দিতে বাধ্য হবেন। শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধি নন, তাঁদের পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের আয়-ব্যয়ের হিসাবও দিতে হবে।
তিনি শ্রমিকদের প্রসঙ্গে বলেন, চা-বাগানের আমাদের শ্রমিক ভাই-বোনেরা যারা আছে, যারা অত্যন্ত অমানবিক জীবনযাপন করে এবং তাঁদের সন্তানেরা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের সেবা থেকে বঞ্চিত। যুগ যুগ ধরে একই পেশায় পড়ে আছে। আমরা চা-বাগানেও আধুনিকতা কায়েম করব, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ করব, সেই মানুষগুলোরও জীবনমানের পরিবর্তন করব ইনশাআল্লাহ। তাঁদের একটা সন্তানও শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হবে না। আমরা বারবার বলে আসছি- এই দেশে বংশানুক্রমে আমরা দেখছি রাজার ছেলে রাজা হয়, রানির ছেলে রানি হয়। আমরা সে ধারা পাল্টে দিতে চাই। একজন সাধারণ শ্রমিকের সন্তান যদি মেধাবী হয় তাহলে আমরা চাই সে মেধার বিকাশ ঘটিয়ে আগামী দিনের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবে। সেই রাজনীতিই আমরা চালু করতে চাই।
এদিকে, ডা. শফিকুর রহমান শনিবার মৌলভীবাজারে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমাদের সিলেট এয়ারপোর্ট পূর্ণমানের আর্ন্তজাতিক এয়ারপোর্ট না হবার কারণে শুধু বিমানের উঠানামা হয় তাও লন্ডন থেকে। আর মাঝে মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ থেকে দু’একটা বিমান সিলেট হয়ে ঢাকা যায়। কিন্তু আমাদের বিপুল সংখ্যক মানুষ ইউরোপ আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আছেন। বাংলাদেশে তিনটি আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট আছে। দুইটি এয়ারপোর্টে এয়ারলাইনস নামে। কিন্তু সিলেটে আসে না।
তিনি বলেন সিলেটিরা মুক্তিযুদ্ধের পর দেশের অর্থনীতিতে বিরাট অবদান রেখেছে। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে সিলেট পূর্ণাঙ্গ আর্ন্তজাতিক এয়ারপোর্ট হবে। যুক্তরাজ্যের ম্যানচেষ্টার থেকে ফ্লাইট সিলেট আবার আসবে। তিনি আরও বলেন, এই দেশ এগিয়ে যাবে যুবকদের হাত ধরে। এই দেশকে যুবকদের হাতে তুলে দিতে চাই। মুখের কথা নয়, ঠুটের কথা নয় এটা আমাদের বুকের কথা। যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে এই জাতি তাদের কাছে চিরদিন কৃতজ্ঞ থাকবে।
জামায়াত আমীর বলেন, আমরা পাহাড়ি, সমতল, নিন্মাঞ্চল এবং সকল জাতি বর্ণ ও শ্রেণির মানুষদের নিয়ে একটি শান্তি ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশ গড়তে চাই। যেখানে থাকবেনা কোনো ভেদাভেদ। একটি শ্রেণি সম্পদের পাহাড় গড়বে, আরেকটি শ্রেণি থাকবে ভূখা এটা আমরা হতে দেবো না। আগামী ১২ তারিখের ভোট হবে বাংলাদেশ পরিবর্তনের ভোট। এটা ২৪ এর যোদ্ধাদের আকাঙ্ক্ষার ভোট। এই ভোটের সাথে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হলে একটি পরিবর্তিত বাংলাদেশ আমরা পাবো।
চা শ্রমিকদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমি চায়ের রাজধানী মৌলভীবাজারে জন্মগ্রহণ করেছি। চা শ্রমিকদের ভুলে গেলে আমি নিজেকেই ভুলে যাব। আমি তাদের জন্য দুটি বিষয় নিশ্চিত করব। একটি স্বাস্থ্য ও অন্যটি সুশিক্ষা। আমরা চাইনা শুধু রাজার ছেলে রাজা হবে, রাণীর মেয়ে রাণী হবে। আমরা চাই যদি একজন শ্রমিক ভাই বা বোনের মেধাবী সন্তান হয় রাষ্ট্র তার মেধা বিকাশের দায়িত্ব নিবে এবং সে একদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী হবে।
প্রবাসীদের কল্যাণমূলক পরিকল্পনা বলেন, দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অনেক লোকজন দেশের বাইরে যান। সেখানে অনেক প্রবাসী ভাইয়ের মৃত্যু হলে তাদের নিয়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। আমরা এটা চাইনা। আমরা চাই রাষ্ট্র তার নিজ দায়িত্বে এই লাশগুলো সম্মানের সাথে বাংলাদেশে নিয়ে আসবে। আবার কোন শ্রমিক প্রবাসে গিয়ে কাজ করতে মারা যায় তার পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া হবে। সে বেওয়ারিশ পড়ে থাকবে না। তার পরিবারের দায়িত্ব নিবে সরকার। দেশে চুরি এবং চাঁদাবাজি বন্ধ হলে এই দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করা যাবে।
হ্যাঁ ভোট নিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, গণভোট বাংলাদেশকে বদলে দেওয়ার ভোট, নতুন বাংলাদেশের জন্মের ভোট, চব্বিশের যোদ্ধাদের, শহীদদের আকাঙ্খার ভোট। সেই ভোট হচ্ছে গণভোট। সেই ভোটে হ্যাঁ হবে। হ্যাঁ মানে আজাদি, না মানে গোলামী। জনতার উদ্দেশ্যে জামায়াত আমীর বলেন, আজাদী না গোলামী? সমস্বরে জনতা বলে উঠেন আজাদি। কুলাউড়া আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী সায়েদ আলীকে নিয়ে জামায়াত আমীর বলেন, কুলাউড়া আসনে প্রার্থী দুইজন। একজন সায়েদ আলী। আর ছায়াপ্রার্থী হিসেবে আছি আমি। কুলাউড়া নবীন চন্দ্র স্কুল মাঠে আয়োজিত জনসভায় জামায়াতের মৌলভীবাজার জেলা সেক্রেটারি মো. ইয়ামির আলীর পরিচালনায় এবং মৌলভীবাজার জেলা জামায়াতের আমীর ও মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) সংসদীয় আসনের ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মো. সাহেদ আলীর সভাপতিত্বে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুর রহমান, ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগা ও শিবিরের কেন্দ্রীয় কার্যকরি পরিষদের সদস্য শরিফ মাহমুদ।
















