এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘন করে প্রভাষক পদে নিয়োগের সুপারিশ, এনটিআরসিএতে অভিযোগের স্তুপ

নিজস্ব প্রতিবেদক: মো. মাসুম বিল্লাহ। ২০১৭ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এম এ পাশ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। জিপিএ-৪ এর মধ্যে ৩ দশমিক ৮০ এর বেশি পয়েন্ট পেয়েছেন ‘ইসলামিক স্টাডিজ’ সাবজেক্টে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া এই শিক্ষার্থীকে এবার ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)’ ভোলা জেলার চরফ্যাশন উপজেলার চরমাদ্রাজ ফাজিল মাদ্রাসায় আরবি প্রভাষক পদে নিয়োগের সুপারিশ করেছে। তার রোল নম্বর: ৪২৯০১০৪১৪। অথচ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ)’ বিধি অনুযায়ী তার সুপারিশ প্রাপ্ত হওয়ার কথা নয়। কেননা এনটিআরসিএ’র নীতিমালা অনুযায়ী কাম্য শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যাতায় যেসব বিষয় ও প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ রয়েছে মো. মাসুম বিল্লাহ’র ক্ষেত্রে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। একইভাবে সর্বশেষ এমপিও নীতিমালায় আরবি প্রভাষক পদে নিয়োগ প্রাপ্তির জন্য যেসব কাম্য সাবজেক্ট উল্লেখ করা হয়েছে তার মধ্যে মো. মাসুম বিল্লাহ’র সাবজেক্ট উল্লেখ নেই। ফলে নীতিমালা অনুযায়ী মো. মাসুম বিল্লাহকে এমপিও ভুক্ত করতে পারবেন না মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর। নিয়ম-নীতির এমন ব্যত্যয় শুধু মো. মাসুম বিল্লাহর ক্ষেত্রেই ঘটেনি, নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়, এমন অনেককে এবার নিয়োগের সুপারিশ করেছে এনটিআরসিএ। যারা কার্যত এমপিওভুক্ত হতে গিয়ে আটকে যাবেন।

শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশের ক্ষেত্রে ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)’ যে নীতিমালা জারি রেখেছে তাতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বশেষ এমপিও নীতিমালা অনুসারে কোনো মাদ্রাসায় আবরি প্রভাষক নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রার্থীকে “বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড হতে কামিল ডিগ্রি বা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়/ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত মাদরাসাসমূহ হতে কামিল ডিগ্রি অথবা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় হতে আল-কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, দা’ওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ, আল ফিক্হ অ্যান্ড লিগ্যাল স্টাডিজ বিষয়ে অর্নাসসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি, অথবা কোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে আরবি বিষয়ে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে।” অর্থ্যাৎ রাজশাহী বা অন্য কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা শিক্ষার্থী আরবি বিষয়ে প্রভাষক হতে হলে তাকে ওই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘আরবি বিষয়ে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে।’ সেটি না হলে হলে ‘মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর’ তাকে এমপিও ভুক্ত করতে পারবে না, কারণ নীতিমালায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়ার ক্ষেত্রে এমন সুযোগ রাখা হয়নি।

ফলে বহু শ্রমে ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)’ এর সুপারিশ প্রাপ্ত হলেও এর সুফল ভোগ করতে পারছেন না ভোলা জেলার চরফ্যাশন পৌসভার ৫ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা আব্দুল মালেকের ছেলে মো. মাসুম বিল্লাহ। কেননা এমপিও নীতিমালা লঙ্ঘন করে তাকে আরবি প্রভাষক পদে সুপারিশ করেছে এনটিআরসিএ। খবর নিয়ে জানা গেছে, বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ষষ্ঠ গণবিজ্ঞপ্তিতে মো. মাসুম বিল্লাহ’র মতে সুপারিশপ্রাপ্তদের অনেকেই নতুন ভোগান্তিতে পড়েছেন। কেউ জেনারেল ক্যাটাগরির হয়ে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন কারিগরিতে, আবার কাউকে এমন প্রতিষ্ঠানে যোগদান করতে বলা হয়েছে, যেখানে পদ ফাঁকা নেই কিংবা কয়েক বছর পর পদ ফাঁকা হবে। এ রকম অসংখ্য অভিযোগ জমা হচ্ছে এনটিআরসিএতে।

দেশের একটি প্রভাবশালী দৈনিকের রিপোর্ট বলছে, এমন আরেক একজন ভুক্তভোগী অনিক সাহা। জেনারেল ক্যাটাগরি থেকে স্কুলশিক্ষক পদে আবেদন করলেও তাঁকে সুপারিশ করা হয়েছে কারিগরি পদে। ফলে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েও চাকরিতে যোগদান করতে পারছেন না তিনি। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ না করে অনিক জানিয়েছেন, ‘এখানে পদ ফাঁকা ছিল কারিগরিতে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান চাহিদাপত্রে ভুল করে তা উল্লেখ করেনি। আমার যে সাবজেক্ট তা কারিগরিতে নেই, কিন্তু আমাকে কারিগরিতে যোগদান করতে বলা হয়েছে। আমি নতুন প্রতিষ্ঠানের জন্য এনটিআরসি আবেদন করেছি।’

মাসুম বিল্লাহ আর অনিক সাহাই নন, এ রকম অসংখ্য প্রার্থীর অভিযোগ জমা পড়ছে এনটিআরসিতে। ঠিক কতগুলো অভিযোগ জমা পড়েছে, তা এনটিআরসিএও নিশ্চিত নয়। ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই শতাধিক প্রার্থী ভুল প্রতিষ্ঠান বা ভুল বিষয়ে সুপারিশের কারণে যোগদান করতে পারছেন না। নানা ছলাকলা করে যোগদান করলেও শেষ পর্যন্ত তারা এমপিওভুক্ত হতে পারবেন না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ‘বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)’ এর উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) প্রফেসর মোহাম্মদ আবদুর রহিম খোন্দকার এ প্রতিবেদককে বলেন, কেউ যদি সাবজেক্ট ক্রস করে (এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী সঠিক সাবজেক্টের ব্যত্যয় ঘটায়) তাহলে তো এমপিওতে আটকে যাবে। এটা আটকে যাওয়ারই কথা। তিনি বলেন, সুপারিশ করার ক্ষেত্রে আমরা কাম্য (যে বিষয়ে জন্য যে চাহিদা উল্লেখ করা আছে) বিষয়ের আলোকেই সুপারিশ করে থাকি। আবার এমপিও নীতিমালার সঙ্গেও সিমিলারেটি (সামাঞ্জস্যতা) রাখি। কেননা, এমপিও নীতিমালার সঙ্গে সামাঞ্জস্যতা রেখেই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। এমপিও নীতিমালায় যে কাম্য শিক্ষকের যোগ্যতা, তার সঙ্গে মিল রেখেই আমাদের বিজ্ঞপ্তিটা দেওয়া হয়। আমাদের আইন, বিধি ও পরীক্ষার নোটিশে বলা আছে, কেউ যদি সাবজেক্ট ক্রস করে (এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী সঠিক সাবজেক্টের ব্যত্যয় ঘটায়) তাহলে তার সনদ বাতিলও হতে পারে। তাছাড়া এমপিওতেও এমনেতেই আটকে যাবেন তিনি।

Facebook Comments Box