বিএডিসিতে ফ্যাসিস্টের সহযোগীকে টাকার বিনিময়ে পদোন্নতি

বিশেষ প্রতিবেদক

Last Updated on: এপ্রিল ২২, ২০২৫

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি ) বাগেরহাটের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফ্যাসিস্টের সহযোগী মোঃ জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, সীমাহীন দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সহকারী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দিয়ে নতুন পদে দায়িত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
উল্লেখ্য যে, গত ১৭ এপ্রিল বিএডিসির মোঃ জামাল উদ্দিনকে ঝালকাঠি (ক্ষুদ্রসেচ) জোনের সহকারী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্ব হিসেবে পদায়ন করে আদেশ জারি করা হয়েছে।
এরআগে বিএডিসির প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ) মুহাম্মদ বদিউল আলম সরকারের প্রস্তাবে গত ১৫ এপ্রিল বিএডিসি বাগেরহাট ক্ষুদ্রসেচ ইউনিটের উপসহকারী প্রকৌশলী জামাল উদ্দিনকে বিএডিসি বরিশাল সদর (সওকা) নিজ দায়িত্বসহ এবং বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর জেলা সেচ উন্নয়ন প্রকল্পের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদে বদলীর আদেশ জারি করে বিএডিসি। এরপর ১৭ এপ্রিল জামাল উদ্দিন বরিশাল বিএডিসি সেচ ভবনে যোগদান করতে গেলে ফ্যাসিবদের দোসর হওয়ায় ছাত্র জনতা তাকে বাধা প্রদান করে। তাৎক্ষণিকভাবে জামাল উদ্দিন সেখানে যোগদান না করে অনেকটা পালিয়ে যান। ওইদিন বিকালেই জামাল উদ্দিনকে ঝালকাঠিতে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদায়ন দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে সংস্থাটি।
একজন বিতর্কিত, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে টাকার বিনিময়ে ঝালকাঠি জেলার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলায় প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কারণ, বিএডিসিতে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী দোসরদের দৌরাত্ম বন্ধ হয়নি এখনো।
এই চক্রটি অবৈধভাবে লেনদেনের মাধ্যমে মোঃ জামালউদ্দিনের ইচ্ছানুযায়ী তাকে পছন্দের জেলায় পদায়ন করেছে। কারণ বর্তমানে একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে ঝালকাঠিতে। এই কারণেই জামাল উদ্দিন নিজেকে মোটা অঙ্কের অর্থ উৎকোচের মাধ্যমে বদলির আদেশ করে নিয়েছে সেখানে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের আমলে জামাল উদ্দিন পিরোজপুর ও বাগেরহাটে দাবড়িয়ে বেড়িয়েছেন।সরকারি চাকরিবিধি লংঘন করে নিজেকে ছাত্রলীগ কর্মী দাবি করে, পিরোজপুর ও বাগেরহাটে ক্ষমতাশালী দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মহড়া দিয়ে বেড়াতেন। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের যোগসাজশে সাধারণ মানুষের সাথে অসভ্য আচরণ ছাড়াও অর্থ আত্মসাৎ এবং দালালি করে বেড়াতেন।
বিএডিসিতে গত ৫ আগস্টের পরে একটি চক্র টাকার বিনিময়ে ফ্যাসিবাদের দোসরদের পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে। এ নিয়ে গণমাধ্যমে একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও চক্রটির বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ কারণে অপরাধ চক্রটি আরো বেপরোয়াভাবে তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বিএডিসিতে এই চক্রটি বিগত বছরগুলোতেও আওয়ামী দোসরদের সাথে মিলেমিশে বেপরোয়া বদলি বাণিজ্য ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়নের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ আমলে বেশ কয়েজন কর্মকর্তা প্রকল্প পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন, এরাই আবার বর্তমানে নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে সর্বোচ্চ পদে বসে অবৈধ বদলি বাণিজ্যসহ নানা অনিয়ম করে যাচ্ছেন।
অভিযোগ উঠেছে, ফ্যাসিস্টের দোসর হিসিবে পরিচিত দুর্নীতিবাজ বিতর্কিত জামাল উদ্দিনকে টাকার বিনিময়ে বরিশাল প্রকল্পে বদলী করা হয়েছে। এছাড়া জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে নানান অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।
জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগে জানা যায়, গত বছরের ২৮ মে বিএডিসির খুলনা রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী কাছে টাকা ফেরৎ পাওয়ার জন্য আবেদন করেন বাগেরহাট জেলার মোল্লাহাট উপজেলার শেখ মনসুর আলীর ছেলে এসএম আইয়ুব আলী।
অভিযোগে বলা হয়, উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো: জামাল উদ্দিন মোল্লাহাট উপজেলার ৫৪ নং গিরিশনগর মৌজায় দুই একর জমিতে ভুক্তভোগীর মাছের ঘেরসহ নিজস্ব চার একর জমি ও পার্শবর্তী মালিকদের বিশ একরেরও অধিক ভূমি বিগত ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি পরিদর্শন করেন এবং ৫০০ মিটার বারিড পাইপ লাইন নির্মান করে দিবেন মর্মে অভিযোগকারীর নিকট থেকে ৫০০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা নগদ গ্রহন করেন। পরবর্তীতে পার্শবর্তী লাইন নির্মান চলমান থেকে জানতে পারে যে ব্যারিড ৫০০ মিটার পাইপ লাইন নির্মানে সরকারী কোষাগারে মাত্র ৬০০০ (ছয় হাজার) টাকা জমা দিতে হয়। অতিরিক্ত ৪৪০০০ (চুয়াল্লিশ হাজার) টাকা উক্ত মোঃ জামাল উদ্দিন আত্মসাৎ করেছেন। ফোনে তাকে অতিরিক্ত টাকা ফেরত দিতে বললে তিনি দিতে পারবেন না, পারলে আদায় করে নিও বলে জানান।
এই খুলনা রিজিয়নের নির্বাহী প্রকৌশলী কাছে টাকা ফেরৎ পাওয়ার জন্য আবেদন করেও টাকা পায়নি ভুক্তভোগী। এমনকি, জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন খাল খনন সহ এই দপ্তরের প্রতিটি উন্নয়ন কাজেই জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, দূর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। গত কয়েক বছরে বিএডিসি বাগেরহাটের জোনে দায়িত্বপালন করে তিনি প্রতিটি কাজে অনিয়ম দূর্নীতির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তার এলাকায় বিএডিসির যেসব উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে, তিনি নিজেই সেসবের ঠিকাদারি কাজ করে থাকেন। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ রয়েছে।
এ ব্যাপারে বিএডিসির প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ) মুহাম্মদ বদিউল আলম সরকার বলেন, আমার প্রস্তাবেই তাকে (উপসহকারী প্রকৌশলী মো: জামাল উদ্দিন) বাগেরহাট থেকে বরিশালে বদলী করা হয়েছে। তবে ঝালকাঠি (ক্ষুদ্রসেচ) জোনের সহকারী প্রকৌশলী পদে চলতি দায়িত্বের আদেশের বিষয়ে আমি জানি না। এই বদলি নিয়ে অবৈধ টাকা লেনদেনের বিষয়ে আমি অবগত নই।

Facebook Comments Box