মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে নির্বাচনে প্রভাব পড়বে

সরকার মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এছাড়া ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের তফশিল ঘোষণার ৩৬ দিনের মধ্যে দেশে অন্তত ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে বলে জানান তিনি।

সোমবার টিআইবির কনফারেন্স রুমে কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সেটি অন্য সবকিছুর মতো নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এক্ষেত্রে সরকারেরও দায় আছে। সরকার শুরু থেকে মব সহিংসতা প্রতিরোধে তৎপরতা দেখাতে পারেনি।

মব ভায়োলেন্সের উৎপত্তি নিয়ে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বাংলাদেশে মব সহিংসতা শুরু হয়েছে সরকারের ভেতর থেকে। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে প্রথম মবের উৎপত্তি হয়েছিল। সরকারের বাইরের শক্তি যারা এখন মব করছে, তারা ক্ষমতায়িত হয়েছে সচিবালয়ে মব সৃষ্টির পরে। এর ফলে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়েছে।

নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আর একটি হত্যাকাণ্ডও হবে না—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন ইফতেখারুজ্জামান। তবে সহিংসতার ঝুঁকি শুধু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত নয়, এর পরবর্তী কয়েক দিনও থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের ঘাটতির মধ্যে রয়েছে সহিংসতা, রাজনৈতিক নেতাকর্মীর হেনস্থা, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর হামলা এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার ঘটনা।

২০২৫ সালে দেশজুড়ে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১০২ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে এক হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ হয়েছে। পাশাপাশি, ডিপফেক ও ভুল তথ্যের হুমকি এবং ৫০টির বেশি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার কারণে নির্বাচনি পরিবেশে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

টিআইবি উল্লেখ করেছে, থানা থেকে লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদানের উদ্যোগ নেওয়ায় সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী মোট জনবলের মাত্র ৯-১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য থাকায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ঘাটতি রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের, বিশেষ করে গত তিনটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তাদের বাদ দেওয়া, উপদেষ্টাদের দলীয়করণ এবং নিরপেক্ষতা বজায় রাখা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংশয় ও মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। জামায়াত, এনসিপি এবং ইসলামী আন্দোলনের মতো দলগুলো ‌‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিতকরণে প্রশ্ন তুলেছে।

এছাড়া ৪৬টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট আবেদন দাখিল করা হয়েছে। প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারযোগ্য নয়।

ইলেকশন কমিশন কর্তৃক প্রাথমিকভাবে বাছাই করা ৭৩টি পর্যবেক্ষক সংস্থার অনেকগুলোই ‘নামসর্বস্ব’ বা সক্ষমতাহীন বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রার্থীর মনোনয়ন যাচাই-বাছাই, ঋণ খেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্বের ভিত্তিতে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো থেকে কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ এসেছে। এছাড়া হলফনামায় দাখিলকৃত তথ্য যাচাই করার সক্ষমতা বা ব্যবহার নিয়ে ঘাটতি রয়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রতিটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। যদিও কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও কমিশন শক্ত অবস্থান নেওয়ায় নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের দিকগুলোতে ঘাটতি রয়ে গেছে।

প্রতিবেদনটি আরও উল্লেখ করেছে, নির্বাচন ও গণভোট উভয় ক্ষেত্রেই প্রযুক্তি, আইন ও প্রক্রিয়ার বড় সংস্কারের প্রয়োজন। নিরাপত্তা ঝুঁকি এবং এআই ব্যবহার করে ভুল বা অপতথ্য তথ্য ছড়ানোর সম্ভাবনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান। নানা প্রতিকূলতা, অস্থিতিশীলতা এবং অসুস্থ নির্বাচনি প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত নির্বাচনি পরিবেশ কিছুটা সক্রিয় রয়েছে।

Facebook Comments Box