বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। ওয়ার্ল্ড রিস্ক রিপোর্টে ২০২২ অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঝুঁকির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান নবম। তাই দেশের নগরকেন্দ্রিক দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে ৮ দফা সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। শনিবার বিআইপি কনফারেন্স হলে ‘নগর দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে করণীয়: প্রেক্ষিত ঢাকা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় সভায় এসব সুপারিশ করা হয়। আলোচনা সভায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক পরিকল্পনাবিদ শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসানের সঞ্চালনায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন, রাজউকের চেয়ারম্যান মোঃ আনিছুর রহমান মিঞা, বিপিএএ, মোঃ আব্দুল্লাহ আল-মামুন, পরিচালক (যুগ্ম-সচিব), দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, মোঃ ছালেহ উদ্দিন, অধ্যক্ষ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ট্রেনিং কমপ্লেক্স, এস. এম. মেহেদী হাসান, যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক—দক্ষিণ), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ, মোঃ ওয়াজ উদ্দিন, তত্ত¡াবধায়ক প্রকৌশলী এবং প্রকল্প পরিচালক ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট, ঢাকা ওয়াসা, মারি মিউরা, সিনিয়র রিপ্রেজেন্টেটিভ (সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট) জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো—অপারেটিভ এজেন্সী (জাইকা), ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন, জ্যোতিষ চন্দ্র রায়, নগর উন্নয়ন সাংবাদিক ফোরামের সভাপতি অমিতোষ পাল ও সাধারন সম্পাদক সোহেল মামুন প্রমূখ। বিআইপির ৮ সুপারিশ হলো, সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক প্রণয়নকৃত ভ‚মিকম্প কন্টিনজেন্সি প্ল্যান বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা (অস্থায়ী আশ্রয়সমূহের যথাযথ চিহ্নিতকরণ ও এ বিষয়ক জনসচেতনতা বৃদ্ধি)। দুর্যোগবিষয়ক স্থায়ী আদেশাবলি, ২০১৯ এ বর্ণিত যেসব সংস্থার কন্টিনজেন্সি প্ল্যান তৈরির কথা উল্লেখ রয়েছে তা অতি সত্বর প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃক দ্রæত কার্যক্রম গ্রহণ করে জলাধারসমূহ চিহ্নিত করা বিশেষকরে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাকে প্রাধান্য দেওয়া। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (২০২২-২০৩৫) এ বর্ণিত জলাধার, ও উন্মুক্ত স্থানের শ্রেণি পরিবর্তন না করা এবং উক্ত জলাধার ও উন্মুক্ত স্থানের স্থানিক এলাকা নির্ধারিত করা। বিল্ডিং কোড প্রয়োগ সম্পর্কিত প্রস্তাবিত সুপারিশসমূহ বাস্তবায়ন করা। পর্যায়ক্রমে সকল ধরনের পেশাজীবী নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করা। ইলেক্ট্রনিক কন্সট্রাকশন পারমিটিং সিস্টেম কার্যকর করা। কাঠামো নকশা, যন্ত্রকৌশল নকশা, বৈদ্যুতিক নকশা এবং প্লাম্বিং নকশা পরীক্ষা করা ও প্রয়োগ নিশ্চিত করা।
আলোচা সভায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন বলেন, দুর্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আর্দশ। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে আমাদের দেশ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রদক্ষেপ গ্রহন করেছে এবং সাফল্যের সাথে তা বাস্তবায়ন করছে। তবে পরবর্তীতে যে ৮০% মানুষ নগরে বাস করবে তাদের কে কিভাবে স্বস্তির সাথে রাখবো তা চিন্তা করে আমাদের আগে থেকেই নগর ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহন করতে হবে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, কিভাবে ঢাকা শহরে খেলার মাঠ, পুকুর সময়ের সাথে ধ্বংস হয়েছে, যা দুর্যোগ ঝুঁকি কমাতে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নতুন ভবন গঠনের ক্ষেত্রে তিনি ওয়াটার কঞ্জারভেশন কর্মসূচি, গ্রীণ ইনফ্রাস্ট্রাকচার, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি তার কর্মঅভিজ্ঞতা থেকে বলেন, পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য বাহিরের দেশের অনেক পরিকল্পনাবিদ কাজ করেন যার সংখ্যা আমাদের দেশে নগণ্য। তাই পরিকল্পিত উন্নয়নের জন্য আমাদের দেশে নগর পরিকল্পনাবিদদের অন্তর্ভুক্তির কোন বিকল্প নেই। সর্বোপরি, সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে স্ব স্ব দ্বায়িত্ব পালনে আহবান জানিয়ে তিনি তার বক্তব্য শেষ করেন।
সভায় বক্তারা বলেন, অগ্নিকান্ড, জলাবদ্ধতা, ভ‚মিকম্পমতো আরও বিভিন্ন দুর্যোগের সম্মুখীন হবার তীব্র সম্ভাবনা রয়েছে ঢাকার। বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর এর ২০১৩ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট অগ্নিকান্ডের প্রায় ১৫-১৮% ঢাকায় ঘটিত, যা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। জানুয়ারি ২০২৩ থেকে এপ্রিল ২০২৩ পর্যন্ত ঢাকা কেন্দ্রীয় অঞ্চলে অগ্নিকান্ডের সংখ্যা ৩৫ টি, যার মধ্যে বঙ্গবাজার অগ্নিকান্ড, ঢাকা নিউ সুপার মার্কেট অগ্নিকান্ড, সিদ্দিক বাজার এর বিস্ফোরণ ও অগ্নিকান্ড এর মতো আরও অনেক গুলো ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের সাক্ষী ঢাকার নগরবাসী। এফএসসিডি কর্তৃক ২০১৭ সালে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল, যেখানে ঢাকায় অগ্নিকান্ড ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা ছিল প্রায় ২৬৫১টি।
বাংলাদেশের ভ‚মিকম্প ঝুঁকি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ১৮৫০ সাল থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৫টি বড় মাত্রার ভ‚মিকম্পের সম্মুখীন হয়েছে। বর্তমান সময়ে বড় মাত্রার ভ‚মিকম্প না ঘটলেও বাংলাদেশের ভৌগলিক অবস্থান ও টেকটোনিক প্লেট (মধুপুর ফল্ট, ডাউকি ফল্ট, প্লেট বাউন্ডারি ফল্ট-১,২,৩) এর অবস্থান মিলে এ শহরটিকে একটি বড় ভ‚মিকম্প ঝুঁকির মাঝে রেখেছে। সিডিএমপি কর্তৃক ২০০৯ সালের একটি গবেষণা থেকে দেখা যায়, সরাসরি ঢাকা শহরের ভ‚পৃষ্ঠে ৬ মাত্রার ভ‚মিকম্প হলে নগরের প্রায় ৫৬ শতাংশ ভবন ধ্বসে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে যা স¤প্রতি ঘটে যাওয়া তুরস্কের ভ‚মিকম্পের মতো অনেক বড় একটি বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে।
এছাড়াও বক্তারা দেশে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত কিছু পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে বক্তারা আরো বলেন, প্রথমত, বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০ এ ভবন বা ইমারত নির্মাণের পূর্ণাঙ্গ নির্দেশনা থাকা সত্বেও বাস্তবে তার সঠিক প্রয়োগ হচ্ছেনা। বিল্ডিং পারমিট ও পরিদর্শনের ক্ষেত্রে স্থাপত্য নক্সা, কাঠামো নক্সা, অগ্নি প্রতিরোধ নক্সা ও যন্ত্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও প্লাম্বিং সংক্রান্ত নক্সা যাচাই করার কথা থাকলেও শুধু স্থাপত্য নক্সা পরীক্ষা করা হয়, কাঠামো নক্সা, যন্ত্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও প্লাম্বিং সংক্রান্ত নক্সা এবং ৭ তলার নিচে অগ্নি প্রতিরোধ নক্সা বর্তমানে পরীক্ষা করা হয় না। যার ফলে ভবন নির্মাণের সময়ই ভবনে দুর্যোগ ঝুঁকি থেকে যায়। দ্বিতীয়ত, ঢাকা শহরের বেশিরভাগ এলাকাই জলাধার ভরাট করে নির্মিত হয়েছে। এক্ষেত্রে লিকুফ্যাকশন ফ্যাক্টরের উপর ভিত্তি করে উক্ত এলাকার ভ‚মিকম্প রিস্ক নির্ধারিত হয়। ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান অনুযায়ী, ভ‚মিকম্প রিস্ক বিবেচনা করে ড্যাপ আপডেট করা হবে। আরবান রেজিলিয়েন্স প্রোজেক্ট, ২০২২ এ উক্ত ফ্যাক্টরের উপর ভিত্তি করে ভ‚মিকম্প রিস্ক ম্যাপ তৈরি করা হলেও ড্যাপ এখনো আপডেট করা হয়নি। তৃতীয়ত, ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান, ১৯৯৫-২০১৫ এ ঢাকা শহরে দুর্যোগ ঝুঁকি এড়াতে ঢাকাব্যাপী রিটেনশন পুকুর প্রস্তাব করা হয়েছিল। উক্ত ম্যাপের সাথে ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান, ২০১৬-২০৩৫ তুলনা করলে দেখা যায় শুধু পশ্চিম পার্শ্বে তা বাস্তবায়িত হয়েছে। চতুর্থত, ড্যাপ (২০২২-২০৩৫) এবং ঢাকা ওয়াসা কর্তৃক প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান (২০১৬) এ প্লাবনভ‚মি অঞ্চলের অমিল পরিলক্ষিত হয়। পঞ্চমত, ড্যাপ ২০১০-২০১৫ অনুযায়ী ২০ ফিট রাস্তা প্রস্তাবিত থাকলেও ড্যাপ ২০২২-২০৩৫ এ তা পরিবর্তন করে ৬-৮ ফুট প্রশস্ত রাস্তার পাশে ১.২৫ এফএআর যুক্ত ভবনের অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অধিক মাত্রার ভ‚মিকম্পে ইভাকুয়েশন করা দূরুহ হয়ে পড়বে। উক্ত রাস্তার একটি ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি প্রবেশ করানো প্রায় অসম্ভব।
















