দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। মুসলমানদের সর্ববৃহৎ এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ঢাকার কোরবানির হাটগুলোতে এখন কেনাবেচার চূড়ান্ত ব্যস্ততা। সরকারি-বেসরকারি অধিকাংশ অফিসগুলোতে ঈদের ছুটি শুরু হয়ে যাওয়ায় সকাল থেকেই পশুর হাটগুলোতে ক্রেতারা ভিড় জমাচ্ছেন। তবে সকালের দিকে তুলনামূলক পশুর উপস্থিতি কম থাকলেও দুপুর পর থেকেই জমে উঠছে হাটগুলো।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত দুই দিনের তুলনায় আজকের দিনে পশু বিক্রি বেড়েছে। বড় গরুর তুলনায় ছোট গরুর চাহিদা তুঙ্গে। যদিও দাম এখনও কিছুটা বেশি, তবে শেষ মুহূর্তে ক্রেতারা দরদাম করেই গরু নিচ্ছেন।
বুধবার (৪ জুন) দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর গাবতলী কোরবানির পশুর হাটে সরেজমিনে ঘুরে, হাট সংশ্লিষ্ট ও ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নির্ধারিত গেট পেরিয়ে পাশে ইট-বালুর মাঠ ও সড়ক পর্যন্ত ত্রিপল টাঙিয়ে রাখা হয়েছে পশু। ভেতরে এবং বাইরে দুই স্থানেই ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গরু বাছাই করে যাচ্ছেন ক্রেতারা। কেউ পছন্দ করে কিনে ফেলছেন, কেউ আবার দাম যাচাই করে ফিরে যাচ্ছেন।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজধানীর পশুর হাটগুলোতে এবার চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, পাবনা, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁ, নাটোর ও ময়মনসিংহ অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ গরু এসেছে। গাবতলী হাটে কর্মরত একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় পাঁচশোর বেশি গরু হাটে প্রবেশ করেছে। তবে পশুর আমদানি বেড়েছে বলেই দাম যে কমেছে, এমন নয়। খামারিরা বলছেন, খরচ এত বেড়েছে যে গরুর দাম কমানো সম্ভব হচ্ছে না।
এবার হাটে গরুর সরবরাহ মোটামুটি স্বাভাবিক হলেও দাম অনেকটাই ‘চড়া’ বলে মন্তব্য করেছেন বেশিরভাগ ক্রেতা। ছোট আকারের গরুর দাম শুরু হচ্ছে ৭০-৮০ হাজার টাকা থেকে। মাঝারি গরু বিক্রি হচ্ছে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে। বড় গরু ৩ লাখ থেকে শুরু করে ৬-৭ লাখ টাকাও হাঁকা হচ্ছে।
গাবতলী হাটে দেখা মিলল বাড্ডা থেকে আসা একটি পরিবারের। তাদের মধ্যে শাহীন হোসেন নামক একজন জানান, দুইটা মাঝারি গরু দেখেছি। একটা ১ লাখ ৫০, আরেকটা ১ লাখ ৮০ চাচ্ছে। গতবার এই সাইজের গরু ১ লাখ ২০ হাজারের মধ্যে পেয়ে গিয়েছিলাম। দাম একটু বেশি হলেও পশুগুলোর মান ভালো, তাই ভেবে দেখছি।
ক্রেতাদের অভিযোগ, হাট থেকে পশু বাড়ি নেওয়ার খরচ এখন আকাশছোঁয়া। বিশেষ করে পিকআপ ভাড়া অতীতের তুলনায় অনেক বেশি।
মিরপুরের বাসিন্দা আজিজুর রহমান বললেন, একটা মাঝারি গরু কিনেছি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকায়। গাবতলী থেকে ডেমরায় নিতে ৫ হাজার টাকা চাইছে। ৩ হাজারে রাজি করিয়েছি। কিন্তু এই খরচটাও অনেক।
বিক্রেতারা বলছেন, এবারের কোরবানির হাটে ক্রেতাদের মধ্যে ছোট ও মাঝারি গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। বিশেষ করে ১০ থেকে ১৮ মনের গরু বেশি বিক্রি হচ্ছে। তাদের দাবি, বর্তমান বাজারে ৬ থেকে ৮ মনের গরু আনুমানিক ২৪০-৩২০ টাকা কেজিতে ৮৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও ১০-১২ মনের গরু ৪০০-৪৮০ টাকা কেজিতে আনুমানিক দেড় থেকে দুই লাখের মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়াও ১৫ থেকে ১৮ মনের গরু ৬০০ থেকে ৭২০ টাকা কেজিতে দুই লাখ ২০ হাজার থেকে দুই লাখ ৮০ হাজার পর্যন্ত কেনাবেচা হচ্ছে। তবে ২০ মনের অধিক গরু ৮০০ টাকা কেজিতে সাড়ে ৩ লাখ থেকে সাড়ে ৪ লাখে (কম চাহিদা) বিক্রি হচ্ছে।
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজধানীর গাবতলী, শ্যামপুর ও শনির আখড়ার হাটগুলোতে পশুর সরবরাহ থাকলেও দাম ও বিক্রির বিষয়ে দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের গরু তুলনামূলক ভালো দামে বিক্রি হলেও বড় গরুর ক্রয়-বিক্রয়ে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নরসিংদী থেকে গরু নিয়ে আসা খামারি মো. বাশার আলী বলেন, আমি ৮টা ছোট গরু এনেছি। এর মধ্যে ৬টা বিক্রি হয়ে গেছে। ৮০ থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি করেছি। ছোট গরুর চাহিদা বেশি, কারণ ঢাকায় অনেকে বাসায় রাখার জায়গার অভাবে বড় গরু কিনতে চায় না।
পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা সিরাজগঞ্জের খামারি আমিনুল ইসলাম বলছিলেন, আমি মাঝারি-বড় মিলিয়ে ১০টা গরু এনেছি। এখনও ৭টা পড়ে আছে। দাম চাইলেই ক্রেতারা কেবল দেখে চলে যাচ্ছে। আমার একটার ওজন প্রায় ২০ মণ, দাম বলেছি ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। তারা বলছে ১ লাখ ৮০ হাজার— এইভাবে তো বিক্রি করা সম্ভব না।
তিনি আরও বলেন, আমরা প্রতি বছরই দেখি, ঢাকায় মানুষ গরু কেনে শেষ সময়ে। এখন যারা হাটে আসছে, তারা শুধু দেখে যাচ্ছেন কিংবা ছোট গরু কিনছেন। বড় গরুর ক্রেতারা এখনও মাঠে নামেননি। আমরা ধরে নিচ্ছি বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে শুক্রবার পর্যন্ত মূল ক্রেতারাই হাটে আসবেন। তখন বিক্রিও দ্বিগুণ হবে, দামও কিছুটা বাড়বে।















