নিজস্ব প্রতিবেদক
বর্ষা এলেই যে ঢাকাবাসীকে জলাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়, তার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতা আর পরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। প্রতিটি বর্ষায় যে পানি জমে, সেটি শুধু আকাশের বৃষ্টির কারণে নয়; আমাদের নিজেদের সিদ্ধান্তহীনতার ফল। ঢাকাকে বাঁচাতে হলে পানির স্বাভাবিক পথ ফিরিয়ে দিতে হবে। জলাবদ্ধতা প্রকৃতির সৃষ্টি নয়, এটি সমন্বয়হীনতা ও পরিকল্পনার ঘাটতির ফল। সমন্বিত পরিকল্পনা ও জবাবদিহির মাধ্যমে ঢাকাকে পুনর্জীবিত করা সম্ভব। ঢাকা ঘুরে দাঁড়াতে পারলে দেশের অন্য শহরগুলোর জন্যও একটি গণবান্ধব ও প্রকৃতিবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার পথ তৈরি হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা)’র উদ্যোগে গতকাল শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিকমিয়া হলে “বৃষ্টি নয়, সমন্বিত অব্যবস্থাপনায় ডুবছে ঢাকা” শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বাপা’র সভাপতি অধ্যাপক ড. নুর মোহাম্মদ তালুকদার এর সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আলমগীর কবির এর সঞ্চালনায় উক্ত সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপা’র নির্বাহী সদস্য ও বাপা নগরায়ন কমিটির আহ্বায়ক স্থপতি ইকবাল হাবিব। সেমিনারে সম্মানিত আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট পানি বিজ্ঞানী বাপা’র সহ-সভাপতি অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ, বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী বাপা’র সহ-সভাপতি, খুশি কবির, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক, জনাব রুহিন হোসেন প্রিন্স, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রাক্তন পরিচালক স্থপতি ড. খুরশিদ জাবিন হোসেন তৌফিক, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) এর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য পরিকল্পনাবিদ মো. আনিছুর রহমান প্রমূখ। সেমিনারে বাপা’র অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাপা’র সহ-সভাপতি জনাব মহিদুল হক খান, সহ-সভাপতি জনাব জাকির হোসেন, যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিম দাদ খান, হুমায়ুন কবির সুমন, জাভেদ জাহান, নির্বাহী সদস্য হাজী শেখ আনছার আলী, মোনছেফা তৃপ্তি, ফাহমিদা নাজনিনসহ বাপা জাতীয় পরিষদ সদদ্য ও জীবন সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষজ্ঞগণসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
মূল প্রবন্ধে নগর ব্যবস্থাপনায় সমন্বয়হীনতা প্রসঙ্গে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, নগর ব্যবস্থাপনায় বহু সংস্থা একসঙ্গে কাজ করছে। রাজউক, সিটি করপোরেশন, ভূমি মন্ত্রণালয়, সড়ক ও জনপথ, সেতু বিভাগ, নৌপরিবহন, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, ঢাকা ওয়াসাসহ বিভিন্ন সংস্থা এবং জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সবাই কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। এককভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করে ঢাকার মানুষের দুর্ভোগ দূর করতে পারবে না। অংশগ্রহণমূলক নগর শাসনই এর সমাধান। তিনি আরো বলেন, পরিকল্পনা কমিশন, সিটি করপোরেশন, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিআইডব্লিউটিএ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পেশাজীবী সংগঠন যেমন ইনস্টিটিউট অব প্লানার্স (বিআইপি), ইনস্টিটিউট অব আর্কিটেক্টস (আইএবি), ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইইবি) এবং নাগরিকদের নিয়ে ঢাকার জন্য একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের অংশগ্রহণও নিশ্চিত করতে হবে। একটি সমন্বিত পরিকল্পনা জনগণের সামনে উপস্থাপন করতে হবে, যাতে সবাই অংশ নিতে পারে। পাশাপাশি যে প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হবে, তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে।
অধ্যাপক এম. ফিরোজ আহমেদ বলেন, সমস্যা যখন সামনে আসে আমরা তখনি নড়েচড়ে বসি। সমস্যা পার হলেই সব ভুলে যাই। দেশের সিটি কর্পোরেশনগুলো জলাবদ্ধতার সমাধান খুব কমই করে থাকে। ওয়াসাকেই বেশীরভাগ সমাধান করতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে তালমিলিয়ে আমাদের নতুন করে দেশের ড্রেনেজ ও সুয়ারেজ সিস্টেমের ডিজাইন করতে হবে। খুশি কবির বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কোন ধরনের সমন্বয় নাই। পরিকল্পনা গ্রহণের সময় ভুক্তভোগী, পরিবেশবিদ, সচেতন নাগরিক সমাজ, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সমন্বয় করা জরুরী। পরিকল্পনাকারি ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে খন্ডকালীন পরিকল্পনা পরিহার করে টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে।
মো. নূর আজিজুর রহমান বলেন, ডিজাইনে সাধারণত ৫০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশী বৃষ্টির রেকর্ডকে ধরে ড্রেনের আকার করতে হবে। বর্তমানে আমরা দেখি ড্রেনের অর্ধেকের বেশীই ময়লায় ভরে থাকে। এতে করে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা সিএস রেকর্ড অনুযায়ী ঢাকা শহরের ড্রেনেজ ডিজাইন করার পরিকল্পনা করছি। এটি করা হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশে কমে যাবে। স্থপতি ড. খুরশিদ জাবিন হোসেন তৌফিক বলেন, ঢাকা শহরের অবকাঠামো উন্নয়নের ফলে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সুপরিকল্পিত স্থায়ী পরিকল্পনার মাধ্যমে জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। পরিকল্পনাবিদ মো. আনিছুর রহমান বলেন, দুর্যোগ তখনই ফিরে আসে যখন মানুষ দুর্যোগের কথা ভুলে যায়। আলমগীর কবির বলেন, শুধু প্রকল্প গ্রহণই সমস্যার সমাধান দিতে পারেনা। এর জন্য চাই সঠিক পরিকল্পনা। পরিকল্পনা গ্রহণের সময় অবশ্যই ভুক্তভোগী, বিশেষজ্ঞ, পরিবেশবিদ, ও সংশিষ্ট সংস্থ্যাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করে টেকসই ও দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
















