তিন কিশোরের স্বপ্ন ডুবল ভূমধ্যসাগরে

ইতালি গিয়ে সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন ছিল তাদের। আর এ কারণে সহায়-সম্বল বিক্রি করে দালালদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন মোটা অঙ্কের টাকাও। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ওই দুষ্ট দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ে নৌকাযোগে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ এবং স্বপ্ন ডুবল তাদের।

লিবিয়া থেকে নৌকায় সাগরপথে ইতালি যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কিশোরগঞ্জের সীমান্তবর্তী নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার এক কিশোরের মৃত্যু এবং অন্য দুই যুবক নিখোঁজ থাকার খবর পাওয়া গেছে।

দূতাবাসের মাধ্যমে পাসপোর্ট ও লাশের ছবি দেখে নিহতের পরিবারের সদস্যরা তাকে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় এখনো নিখোঁজ রয়েছেন একই এলাকার আরও দুই যুবক।

নিহত যুবক মো. রাশেদুল ইসলাম (২০) বেলাব উপজেলার সল্লাবাদ ইউনিয়নের ইব্রাহিমপুর গ্রামের মো. আবদুর রউফ মিয়ার ছেলে।

অপরদিকে এ ঘটনায় নিখোঁজ অন্য দুই যুবক হলেন- একই গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে শরীফুল ইসলাম (২২) এবং ইউনুস মিয়ার ছেলে সালাহ উদ্দিন (৩৫)। তারা তিনজনই একে অপরের আত্মীয়।

সালাহ উদ্দিনের মাধ্যমেই রাশেদুল ও শরীফুল সাড়ে আট লাখ টাকা করে দিয়ে অবৈধভাবে ইতালির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা জানান, গত ২৮ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ৩টার দিকে লিবিয়ার একটি সৈকত থেকে নৌকায় করে ইতালির উদ্দেশে অবৈধভাবে রওনা হয় তাদের একটি দল। তিন দিন পর রোববার দুপুরে লিবিয়ার দূতাবাস থেকে লাশের সঙ্গে পাওয়া একটি পাসপোর্টের বরাত দিয়ে রাশেদুলের মৃত্যুর খবর তার পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়।

ওই সময় লাশের ছবি দেখতে চাইলে আরও দুই দিন পর অর্থাৎ মঙ্গলবার রাতে তাদের লাশের ছবি দেখানো হয়। এর পরই রাশেদুলের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত হয় তার পরিবার। তবে একইসঙ্গে থাকা নিখোঁজ দুজনের সম্পর্কে এখনো কিছুই জানতে পারেনি তাদের পরিবার।

নিহত রাশেদুলের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে রাশেদুল ছিল দ্বিতীয়। তার বাবা কৃষিকাজ করেন। রাশেদুল স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে ২০১৮ সালে এসএসসি পাশ করে উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হন পার্শ্ববর্তী ভৈরবের হাজি আসমত আলী কলেজে। কিছুদিন কলেজে যাওয়া-আসার পরই সংসারের টানাপোড়নের মাঝে পড়ালেখায় মনোযোগ হারিয়ে ফেলেন তিনি।

অনেক চেষ্টায় পর বাবাকে ইতালি যাওয়ার ব্যাপারে রাজি করান তিনি। আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সাড়ে আট লাখ টাকা ঋণ করে তার হাতে তুলে দেন বাবা। পরে সালাহ উদ্দিনের মাধ্যমে রায়পুরার আদিয়াবাদ এলাকার এক দালালকে ইতালি নিয়ে যাওয়ার শর্তে এ টাকা দিয়ে দেন।

স্বজনরা আরও জানান, গত ৩ ডিসেম্বর ইতালির উদ্দেশে বাড়ি থেকে রওনা হন তারা তিনজন। প্রথমে পাড়ি জমান লিবিয়ায়। সেখানে দেড় মাস অবস্থান করার পর দালালের লোকজন ইতালি নেওয়ার উদ্দেশ্যে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে তাদের নিয়ে যায় লিবিয়ার ত্রিপোলি শহরে। সেখানে ১৫ দিন অবস্থানের পর গত বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকে ভূমধ্যসাগর দিয়ে নৌপথে পাড়ি জমান ইতালির উদ্দেশে।

গত রোববার দুপুরে লিবিয়া দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা তাদের ফোন করে জানান, অবৈধভাবে নৌকায় ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে ঠাণ্ডায় জমে মারা যান রাশেদুল। ওই নৌ-যাত্রায় রাশেদুলের সঙ্গেই ছিলেন শরীফুল ইসলাম ও সালাহ উদ্দিন। ঘটনার পর থেকে তারা দুজন নিখোঁজ রয়েছেন।

নিহত রাশেদুলের বড়ভাই মো. আশিক মিয়া বলেন, গত বৃহস্পতিবার রাতে ইতালির উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে আমাদের সঙ্গে তার সর্বশেষ কথা হয়েছিল। তখন দোয়া চেয়ে বলেছিল, কিছুক্ষণ পরেই রওনা হবো, একটু পরই মোবাইল বন্ধ করে দেব। সবাই আমার জন্য দোয়া করো।

তিনি বলেন, এ ঘটনার তিন দিন পর রাশেদুলের পাসপোর্টের সূত্র ধরে দূতাবাস থেকে ফোন করে তার মৃত্যু খবর জানায় আমাদের। আমরা ভেবেছিলাম, পাসপোর্টটি তার কাছে না থেকে অন্য কারও কাছেও তো থাকতে পারে। তাই লাশের ছবি দেখতে চেয়েছিলাম আমরা।

তিনি আরও বলেন, মঙ্গলবার রাতে আমাদের লাশের ছবি দেখানো হলে আমরা তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হই। সংসারের অভাব দূর করার জন্য ইতালি যেতে গিয়ে ভূমধ্যসাগরেই ডুবল তার স্বপ্ন-সাধ। অবশেষে তাকেই হারিয়ে ফেললাম আমরা। মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তার লাশ দেশে আনার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে নিখোঁজ সালাহ উদ্দিনের বড়ভাই কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর থানার এসআই মনিরুজ্জামান বলেন, অসমর্থিত একটি সূত্রে জানতে পেরেছি, সালাহউদ্দিন ও শরীফুলসহ আরও বেশ কিছু অভিবাসনপ্রত্যাশী কারাগারে আটক রয়েছেন। তবে তাদের সঙ্গে ঠিক কী হয়েছে, আমরা তা নিশ্চিত হতে চাই। সালাহ উদ্দিন এলাকায় ফার্মেসির ব্যবসা করত। এসএসসি পাশ করার পর আর লেখাপড়া করেনি। তার স্ত্রী ও দুই বছরের একটি মেয়ে রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

অন্যদিকে নিখোঁজ শরীফুল ইসলামের বাবা হাবিবুর রহমান বলেন, মূলত সালাহ উদ্দিনের প্ররোচনায় আমার ছেলে শরীফুল ইতালি যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছিল। সে ২০২০ সালে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের হাজি আসমত আলী কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে শরীফুল তৃতীয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে পরিবারের সবার সঙ্গে কথা বলে দোয়া চেয়েছিল সে। এরপর থেকে তার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি আমাদের। আমি আমার ছেলের খোঁজ চাই।

গত ২৫ জানুয়ারি লিবিয়া থেকে নৌপথে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় সাত বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর জানা যায়। নিহতদের মধ্যে একজন ছিলেন নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বেগনাবাজ এলাকার মুদি দোকানি আয়েস আলীর ছেলে সাইফুল মিয়া (২২)।

সবারবাংলা/এসআই

Facebook Comments Box