দল থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের বিষয়ে ব্যবস্থাগ্রহণে জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। বৃহস্পতিবার দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এ চিঠি দেন।
ব্যক্তিগত ভিডিও ভাইরালের প্রেক্ষাপটে নৈতিক স্খলনের দায়ে গত বুধবার সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি গাজী নজরুলকে জামায়াত বহিষ্কার করার পরই প্রশ্ন উঠে, তাঁর পদ থাকবে কিনা। দল থেকে পদত্যাগ, ফ্লোর ক্রসের কারণে অতীতে এমপি পদ বাতিল হলেও, বহিষ্কারের ক্ষেত্রে পদ বাতিলের নজির নেই।
দল কোনো এমপিকে বহিষ্কার করলে কী হবে– তা সংবিধানে বলা নেই। ৭০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো এমপি দল থেকে পদত্যাগ করলে বা বিরুদ্ধে ভোট দিলে এমপি পদ বাতিল হবে।
৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো এমপির নৈতিক স্খলনের কারণে দুই বছরের বেশি সময়ের জন্য কারাদণ্ড হলে এমপি পদ বাতিল হবে। সাজার মেয়াদ শেষে পাঁচ বছর অতিক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত এমপি হতে পারবেন না।
জামায়াত নৈতিক স্খলনের কারণ দেখিয়ে গাজী নজরুলকে বহিষ্কার করেছে। তবে এ সিদ্ধান্ত আদালতের নয় বা গাজী নজরুলের জেল হয়নি। ফলে ৬৬ অনুচ্ছেদ তার জন্য প্রযোজ্য নয়। তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেননি বা দলের বিরুদ্ধেও ভোট দেননি। ফলে ৭০ অনুচ্ছেদও প্রযোজ্য নয় বলে জানিয়েছেন সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি।
সংবিধানের ৬৬(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ‘৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোনো এমপির আসন শূন্য হবে কিনা, সে সম্পর্কে কোনো বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে। কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।’
সংসদ সদস্য আইন-১৯৮১ এর ৩ ধারা অনুযায়ী, ‘বিরোধ সৃষ্টির ৩০ দিনের মধ্যে স্পিকার বিরোধের বিবরণ প্রস্তুত করে শুনানির জন্য নির্বাচন কমিশনকে পাঠাবেন।’ তবে এই বিধানগুলো ৭০ অনুচ্ছেদ-সংক্রান্ত।
তবে গণপ্রতিনিধি আদেশ-১৯৭২ এর ১২(খ) অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি এমপি নির্বাচিত হতে বা পদে থাকতে পারবেন না, যদি তিনি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল মনোনীত না হন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী না হন।
২০০৮ সালে আইনে যুক্ত করা বিধানের কারণে গাজী নজরুল পদ হারাবে বলে কয়েকজন বিশেষজ্ঞ মত দিয়েছেন।
এমপিদের দলে থাকার বিধান কার্যকরের পর ২০১২ সালে সাতক্ষীরা-৪ আসনের এমপি এইচএম গোলাম রেজা জাতীয় পার্টি থেকে বহিষ্কার হয়েও পদে বহাল থাকেন বিষয়টি নিষ্পত্তিতে তৎকালীন স্পিকার নির্বাচন কমিশনকে শুনানীর জন্য চিঠি না দেওয়ায়।
দল থেকে বহিষ্কৃত আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর এমপি পদ বাতিলে এই আইনে ২০১৫ সালে আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশনে গেলে শুনানির আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। ফলে কোনো এমপি দল থেকে বহিষ্কার হলে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ১২(খ) অনুযায়ী পদ বাতিল হবে কিনা– এ সংক্রান্ত রায় আসেনি।
২০১৪ সালে বহিষ্কৃত লতিফ সিদ্দিকীর এমপি পদ বাতিলে ওই বছরই স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেন তৎকালীন স্পিকার শিরীন শারমিন। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে যান লতিফ সিদ্দিকী। তবে হাইকোর্টের পর আপিল বিভাগও তাঁর রিট খারিজ করে দেন।
২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট নির্বাচন কমিশনে শুনানি শুরু হয়। এতে আওয়ামী লীগকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন আইনজীবী এবিএম রিয়াজুল কবীর কাওছার। তিনি বলেন, দল বহিষ্কার করলে এমপি পদ থাকবে না। কারণ আইন অনুযায়ী এমপি দুই রকম; দলীয় ও স্বতন্ত্র। দল বহিষ্কার করলে সেই এমপি স্বতন্ত্র হয়ে যান না। ফলে দলে না থাকলে এমপি পদ থাকবে না।
রিয়াজুল কবীর জানান, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট প্রথম দিনের শুনানিতে লতিফ সিদ্দিকী সময় প্রার্থনা করেন। পরে তিনি নিজেই পদত্যাগ করেন। ফলে কোনো রায় বা আদেশ আসেনি।
গাজী নজরুলের বিষয়ে কী তা স্পিকার ও নির্বাচন কমিশন ঠিক করবে। এর আগেই আদালতে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের রায় বিপক্ষে গেলেও, তিনি আদালতে যেতে পারবেন। ফলে নিজে থেকে পদত্যাগ না করলে গাজী নজরুলের পদ বাতিল হলেও কয়েক মাস থেকে কয়েক বছর লাগতে পারে।















