একটি বাসযোগ্য শহরে কমপক্ষে ১০-১৫ শতাংশ জলাশয় থাকা দরকার হলেও ঢাকার জলাশয়-জলাধার আশংকাজনকভাবে কমছে। ঢাকার জলাধারগুলো নির্বিচার দখলের শিকার। ড্যাপ (ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা), নগর উন্নয়ন আইন, জলাধার সংরক্ষণ আইন ও পরিবেশ সংক্রান্ত আইনকে অমান্য করে পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়ার ডিআইটি পুকুর দখল-সহ এই নগরীর আরো বিভিন্ন পুকুর ও অন্যান্য জলাধার দখল ও ভরাট হচ্ছে, যা খুবই উদ্বেগের। মূলত পানির শহর ঢাকাকে কারবালায় পরিণত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ প্রকৃতি সংরক্ষণ জোট (বাংলাদেশ ন্যাচার কনজারভেশন অ্যালায়েন্স-বিএনসিএ) ও গেন্ডারিয়ার ডিআইটি পুকুর রক্ষা আন্দোলনের যৌথ উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ঢাকায় পুকুর ও জলাধারের প্রয়োজনীয়তা এবং সংরক্ষণে করনীয়” শীর্ষক এই সেমিনার বক্তারা এসব কথা বলেন।
বিএনসিএ এর আহবায়ক ও স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদারের সভাপতিত্বে সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে রিভার এন্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার-আরডিআরসি এর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ দেখান যে, ঢাকা মহানগরীর অবশিষ্ট ৩২৭ পুকুর ও জলাশয়ের মধ্যে ৮৬ টি (যা প্রায় ২৬%) এখন সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও প্রভাবশালী ব্যক্তি কর্তৃক দখলের পথে। এই জলাধারগুলোর মধ্যে ৬ টি দখল হচ্ছে সরকারি উদ্যোগে, ৭৯ টি দখল হচ্ছে বেসরকারি উদ্যোগে এবং বাকি একটি দখল হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে। জলাশয় দখল ও কমে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি- বেলা এর প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ঢাকা সবচেয়ে অবসবাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হয়েছে। এজন্য অন্য অনেকের সাথে রাজউককে দায়ী করে তিনি বলেন, রাজউক একটি সাংঘাতিক অস্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান নিজেই জলাশয় ভরাট করে হাউজিং করছে।
সেমিনারে আরো আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা-৪ আসনের এমপি সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারি পরিচালক বজলুর রশীদ; বিএনসিএ এর যুগ্ম আহবায়ক ও নোঙর ট্রাস্টের প্রধান নির্বাহী সুমন শামস, বিএনসিএ-র সদস্য সচিব ও সেভ আওয়ার সি’র সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ আনোয়ারুল হক; ও নিরাপদ ডেভেলাপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইবনুল সাঈদ রানা। আরো বক্তব্য রাখেন পরিবেশ সংক্রান্ত স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন ‘ইনিশিয়েটি ফর পিস (আইএফপি)’ এর চেয়ারম্যান এডভোকেট শফিকুর রহমান, যাত্রী অধিকার আন্দোলনের আহবায়ক কেফায়েত উল্লাহ চৌধুরী শাকিল, গেন্ডারিয়া ডিআইটি প্লট পুকুর রক্ষা আন্দোলনের আহবায়ক ইব্রাহীম আহমদ রিপন প্রমুখ।
আরডিআরসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ উল্লেখ করেন, তাদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় বর্তমানে মোট ৬৩ টি খাল, ১৩ টি লেক ও একটি আদি চ্যানেলের অস্থিত্ব রয়েছে। তিনি বলেন, নিজেদের প্রয়োজনে এসব পুকুর ও জলাধার রক্ষা করতে হবে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ- রাজউক কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ঢাকার অবশিষ্ট জলাধারগুলো পুনরুদ্ধার করতে পারে। এই নদী ও জলাধার গবেষক বলেন, আইন অনুযায়ী যে কোন ধরণের জলাধার ভরাট নিষিদ্ধ। ব্যক্তি মালিকালাধিন হলেও জলাধার ভরাট করা যে যাবে না, এই ব্যাপারে রাজউকে সার্কুলার ইস্যু করতে পারে। রাজউক আরো সক্ষম ও সক্রিয় হলে ঢাকার জলাধার রক্ষা পাবে। সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি বলেন, পুরান ঢাকার ডিআইটি পুকুর দখলমুক্ত রাখার ব্যাপারে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। যারা এই পুকুর দখল করতে চায়, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ও বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান। রাজউক কর্তৃক উচ্ছেদ হওয়ার পরও ডিআইটি পুকুরে যে অবশিষ্ট স্থাপনা রয়েছে, তা সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে তিনি কাজ অব্যাহত রাখবেন বলে ঘোষণা দেন। ঢাকা-সহ সারাদেশের কোথাও পুকুর ও জলাশয় ভরাট করার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহবায়ক জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী সংসদ অধিবেশনে পরিবেশ ও জলাশয় ইস্যুতে তিনি কথা বলবেন।
















