নিজস্ব প্রতিবেদক:
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) একাধিক প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও কর্মকর্তা সম্প্রতি প্রতারণা ও হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে, মো. জলিল নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নাম ভাঙিয়ে বিএডিসির বিভিন্ন কর্মকর্তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকা আদায়ের চেষ্টা করছেন।
জানা গেছে, বাগেরহাট জেলার মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা এই জলিল কখনো নিজেকে সাবেক কৃষি সচিব ওয়াহিদা আক্তারের আত্মীয়, আবার কখনো ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে থাকেন। এসব পরিচয়ের ভিত্তিতে তিনি প্রকল্প পরিচালক ও কর্মকর্তাদের পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে চাপ প্রয়োগ করেন।
কখনো তিনি সরাসরি প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে, আবার কখনো মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়ে এসব কাজ করানোর চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, জলিল কোনো বৈধ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক নন। তিনি বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হয়ে দালালির কাজ করেন। কাজ না পেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয়, দুদক এমনকি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের নাম ব্যবহার করে মিথ্যা অভিযোগ দাখিল করেন।
বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জলিল প্রথমে মিথ্যা অভিযোগ করে ভয় দেখান, পরে নিজেই সেই অভিযোগ প্রত্যাহারের শর্তে অর্থ বা ব্যক্তিগত সুবিধা দাবি করেন। এতে কর্মকর্তারা মানসিক ও প্রশাসনিক চাপে পড়েন।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য মতে, জলিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাদের “বিএনপি-জামায়াতপন্থী” হিসেবে অভিযোগ দিতেন। বর্তমানে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে উল্টো তাদের “আওয়ামী ফ্যাসিস্ট” আখ্যা দিয়ে অভিযোগ দিচ্ছেন। মূলত, প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে নিজের স্বার্থসিদ্ধিই তার লক্ষ্য।
বিএডিসির কয়েকজন ঠিকাদার জানান, জলিল যেভাবে প্রকল্প পরিচালক ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গণহারে অভিযোগ দিচ্ছেন, তা নিছক নিজের স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে। এতে করে যারা সৎ, তারা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। আর প্রকৃত দুর্নীতিবাজরা তার ছত্রছায়ায় থেকে পার পেয়ে যাচ্ছেন।
তারা জানান, বিএডিসির “স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস প্রজেক্ট” (এসএসিপি)-এর প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী রেজাউর রহমান অপু ও নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুর রহমানের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এই দুই কর্মকর্তা অবৈধভাবে অন্তত প্রায় শত কোটি টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। অথচ জলিলের গণঅভিযোগের কারণে এ রেজাউর রহমান অপু ও শরিফুর রহমানের মতো দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা সহজেই পার পেয়ে যান।
বিএডিসির একাধিক কর্মকর্তা বলেন, “মো. জলিল শুধু ব্যক্তিগতভাবে আমাদের হয়রানি করছেন না, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। এভাবে যদি বহিরাগতরা প্রশাসনের অভ্যন্তরে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে সরকারি কার্যক্রম ব্যাহত হবে।”
তারা আরও বলেন, জলিলের কর্মকাণ্ড শুধু কর্মকর্তাদের নয়, বরং বিএডিসির মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তারা দুর্নীতি দমন কমিশন, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন— জলিলের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার। বিএডিসির প্রধান প্রকৌশলী (নির্মাণ) মুহাম্মদ বদরুল আলম বলেন, “জলিল নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে আমাদের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হয়রানি করে আসছেন বলে মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি আমরা খতিয়ে দেখছি। এছাড়া তিনি যেসব অভিযোগ দিয়েছেন, তা বিএডিসির সদস্য পরিচালক (অর্থ) তদন্ত করছেন।”প্রধান প্রকৌশলী (ক্ষুদ্রসেচ) মুহাম্মদ বদিউল আলম সরকার জানান, জলিল সংস্থার কিছু পুরাতন মালামাল ক্রয় করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তা না পেয়ে কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দেন। তিনি বলেন, “জলিল বিএডিসির কেউ নন, তাই সরাসরি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জটিলতা হচ্ছে। এব্যাপারে অভিযুক্ত জলিলের বক্তব্য জানার জন্য তার দু’টি নাম্বারে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ট্রু কলার তার দু’টি মোবাইল নাম্বারে যথাক্রমে ‘ফ্রড জলিল’ এবং ‘টাউট জলিল ভাই’ নাম আসে।
















