সহনীয় পর্যায়ে কমিশন’ কান্ড:
ইইডির সেই তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক

শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মেনহাজুল হক। ‘সহনীয় পর্যায়ে কমিশন (ঘুষ) খাওয়া’ বিষয়ক মন্তব্যের জেরে শিক্ষা প্রশাসনে এখন সমালোচিত হচ্ছেন। তার এই মন্তব্যে বিব্রত হয়ে ইইডি তার বিরুদ্ধে তদন্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
ইইডির প্রধান প্রকৌশলী মো. আলতাফ হোসেন বুধবার নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের বলেন, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এমন মন্তব্য অত্যন্ত বিব্রতকর এবং চাকরি বিধি আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তিনি এ ঘটনার তদন্ত করে মেনহাজুল হকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে সুপারিশ করবেন। আলতাফ হোসেন আরও জানান, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ইইডি দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
মেনহাজুল হকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ
সম্প্রতি আগারগাঁওয়ের ঢাকা মেট্রো অফিসে অধস্তন কর্মকর্তাদের নিয়ে এক সভায় মেনহাজুল হক ঠিকাদারদের কাছ থেকে ‘সহনীয় পর্যায়ে ঘুষ বা কমিশন’ নেওয়ার ‘ছবক’ দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় উপস্থিত অনেক কর্মকর্তা বিব্রত ও ক্ষুব্ধ হয়ে সদ্য বিদায়ী শিক্ষা সচিবের কাছে নালিশ করেন। তবে অভিযোগ উঠেছে, সাবেক সচিব এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি। শুধু ইইডি নয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও মেনহাজুল হকের মন্তব্যে বিব্রত।
এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (উন্নয়ন) মোহাম্মদ বরাদ হোসেন চৌধুরীও সাংবাদিকদের বলেন, এটি চাকরি বিধিমালার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ইইডির পদক্ষেপ অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেনহাজুল হকের বিরুদ্ধে ঢাকা মেট্রো ও ঢাকা বিভাগের ১৪টি জোন থেকে ‘ফাঁদ তৈরি করে দুর্নীতি’ এবং ‘কমিশন বাণিজ্যের’ গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ঠিকাদারদের দরপত্র ও বিল থেকে কমিশন ছাড়াও বিভিন্ন অজুহাতে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ‘ফ’, ‘শ’ এবং ‘ন’ আদ্যক্ষরের তিনটি জেলার প্রকৌশল অফিসের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই ১৪টি জোন থেকে প্রতিদিন ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় মেনহাজকে, যা ২২ দিনে ৭৭ লাখ টাকায় দাঁড়ায়। এই অর্থ নগদ ক্যাশ ও বিকাশসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়। এমনকি অবৈধ অর্থ গ্রহণের জন্য তিনি একটি বিকাশ এজেন্টও খুলেছেন বলে অভিযোগ, যার নম্বর ০১৮৮১৪৪৫৯০৮। ২০২৩ সালে ঢাকা মেট্রো কার্যালয় ও ঢাকা বিভাগে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি এসব অবৈধ কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছেন এবং দেড় মাস পর অবসরে যাবেন বলে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মেনহাজুল হক সাংবাদিকদের বলেন, যেভাবে রিপোর্ট করার করেন। আমি ভয় পাইনা। আমি যা করছি, যথাযথ নিয়ম মেনেই করছি। কমিশন ও ঘুষ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কমিশন খাওয়ার বিষয়টি প্রকৌশল বিভাগের ‘ওপেন সিক্রেট’। আমি কোনো কিছুই নিয়মের বাইরে করি না। বিকাশে লেনদেন বিষয়ে তিনি তার সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছেন।
আরও যত অভিযোগ
মেনহাজুল হকের বিরুদ্ধে ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল, এস্টিমেট, টেন্ডার বা রিভাইজড এস্টিমেন্ট পাশ না করার অভিযোগও রয়েছে। তার ‘কমিশন বাণিজ্য’ ঢাকা মেট্রো সার্কেল, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বিস্তৃত। অভিযোগ আছে, নির্ধারিত অঙ্ক আদায় না হলে কাজ আটকে থাকে। সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, অধস্তনদের লাঞ্ছনা এবং নারী সহকর্মীকে কটুক্তির অভিযোগও তার বিরুদ্ধে রয়েছে। তিনি ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে সহকর্মীদের পদোন্নতি আটকে রেখেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। পিরোজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও নারায়ণগঞ্জে তিনি একই কায়দায় অর্থ আত্মসাৎ করেছেন বলেও জানা গেছে।

মেনহাজুল হকের ‘ঘুষের ছবক’ নিয়ে ক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা সদ্য বিদায়ী শিক্ষা সচিবের কাছে বিচার চাইলেও অভিযোগ উঠেছে যে, সচিব তাদের কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেননি। বিচার দেওয়া একজন কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, সাবেক সচিব তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন, যা উচ্চপর্যায়ে দুর্নীতির প্রশ্রয়ের ইঙ্গিত দেয়। শিক্ষা প্রকৌশল বিভাগের সৎ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তারা মেনহাজুল হকের এমন কর্মকান্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

Facebook Comments Box