গাজায় চলমান দখল, গণহত্যা, জাতিগত নিধন ও ধ্বংসযজ্ঞের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে ঢাকায় ‘মার্চ ফর গাজা’ সমাবেশ কর্মসূচি পালন করেছে বিভিন্ন ওলামায়ে কেরাম এবং সাধারণ মুসল্লিরা। জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ ফটকে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ হয়। পরে জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে শুরু হয়ে পল্টন, কাকরাইল মোড় হয়ে শান্তিনগর এলাকায় গিয়ে মার্চটি শেষ হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্য ও চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লা শাহি জামে মসজিদের খতিব আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী আল মাদানীর আহ্বানে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। কর্মসূচিতে আরবি, ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় একটি ঘোষণাপত্র ও অঙ্গীকারনামা পাঠ করা হয়। বাংলায় ঘোষণাপত্র পাঠ করেন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম। সমাবেশ থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘকে অবিলম্বে গাজায় গণহত্যা বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি মুসলিম উম্মাহর নেতাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফিলিস্তিন রক্ষায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিতে অনুরোধ করা হয়। মার্চ ফর গাজা’ কর্মসূচিতে ১০ দফা ঘোষণা করা হয়।
সমাবেশে আনোয়ার হোসাইন তাহের জাবেরী বলেন, গাজায় পাখির মতো মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র গাজায় গণহত্যা চালাতে ইসরায়েলকে উৎসাহ দিচ্ছে। এটি বন্ধ করতে হবে। এ সময় তিনি গণহত্যা বন্ধ এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সব মুসলিমকে ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, ফিলিস্তিনের মুক্তি মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব। তাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। গণহত্যা বন্ধ, গাজায় মানবিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয় সংক্ষিপ্ত সমাবেশ থেকে। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব এবং ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) প্রতি ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক অবিলম্বে ছিন্ন করার আহ্বান জানানো হয়।
ঘোষণাপত্রে ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম বলেন, দখলদার ইসরাইলি আগ্রাসনে গাজা মৃত্যুপূর্ণ এলাকায় পরিণত হয়েছে। খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ অবরুদ্ধ করে পুরো জনসংখ্যাকে অনাহারে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত হাজার হাজার শিশু, বৃদ্ধ, সাংবাদিকসহ লক্ষাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। ক্রমাগত বোমা বর্ষণে হাসপাতাল, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় ও মসজিদগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। রাতের আশ্রয়স্থল লক্ষ্য করেও বিমান হামলা চালানো হচ্ছে। জাহিদুল ইসলাম আরও বলেন, সরাসরি গুলি চালিয়ে হত্যা করা হচ্ছে উদ্ধারকর্মীদের। গাজা এখন কসাইখানায় পরিণত হয়েছে, যেখানে নতুন নতুন কবর খনন করা হচ্ছে। প্রতিনিয়ত সেই কবরের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে, নারী ও শিশুদের লাশের সারি দীর্ঘ হচ্ছে। সাংবাদিকদের হত্যা করা হচ্ছে যাতে গণহত্যার সত্যতা বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছায় না। এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, লক্ষাধিক মানুষ কর্মহীন হয়েছে। এই পরিকল্পিত হত্যার প্রতিবাদে বিশ্বের মানুষ রাজপথে নেমেছে। এশিয়া, ইউরোপসহ যেসব অঞ্চলে ন্যায় ও মানবতা আছে, সেখানে গাজার পক্ষে প্রতিবাদ গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশও এর অংশ।
১০ দফা ঘোষণা ও দাবি : বাংলাদেশের পাসপোর্টে “ঊীপবঢ়ঃ ওংৎধবষ” শর্ত পুনর্বহাল করা এবং ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার অবস্থান স্পষ্ট করা। সরকারের সঙ্গে ইসরায়েলি যেসব প্রতিষ্ঠানের চুক্তি হয়েছে, তা বাতিল করা। গাজায় ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা করা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং আমদানি নীতিতে জায়নবাদী কোম্পানির পণ্য বর্জনের নির্দেশনা জারি করা। পাঠ্যবই ও শিক্ষা নীতিতে আল-আকসা, ফিলিস্তিন, এবং মুসলিম সংগ্রামী ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা। *ইসরায়েলি কোম্পানির সঙ্গে যে কোনো ধরনের চুক্তি ও বাণিজ্য বন্ধ। *গাজায় প্রাণ রক্ষার সহায়তা পাঠানো। *দেশের পাঠ্যপুস্তকে ফিলিস্তিন ও আল আকসার ইতিহাস অন্তর্ভুক্তকরণ। *অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে পাঁচ দফা বিশেষ দাবি পেশ। জায়নবাদী ইসরায়েলের গণহত্যার বিচার আন্তর্জাতিক আদালতে নিশ্চিত করতে হবে। যুদ্ধবিরতি নয় বরং গণহত্যা বন্ধে কার্যকর ও সম্মিলিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ১৯৬৭ সালের পূর্ববর্তী ভূমি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাধ্যতামূলক প্রয়াস চালাতে হবে। পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত করতে হবে।
















