এ রায়ে স্পষ্ট হয়েছে কোনো ক্ষমতাশীল আইনের উর্ধ্বে নয়

চব্বিশের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত গণহত্যার দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ-নিরপেক্ষ, প্রশ্নাতীতভাবে আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো প্রধান, বা কর্তা ব্যক্তি, রাজনৈতিক কোনো নেতা যতো বড় ক্ষমতাশীল হোক না কেন, তারা যেন আইনের ঊর্ধ্বে নয় তা এই রায়ে স্পষ্ট হয়েছে।। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হয়ত ক্ষতিপূরণ সম্ভব না, তবে এই রায়ে কিছু স্বস্তি তাদের হৃদয়ে এসেছে। কারণ সুবিচার তারা দেখতে পেয়েছে। সোমবার পতিত স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার রায়ের ওপর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এভাবেই দলের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মাসুম, এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ড. এইচএম হামিদুর রহমান আজাদ, মাওলানা আব্দুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন এবং ঢাকা মহানগর উত্তরের আমির ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য সেলিম উদ্দিন প্রমূখ।

এই বিচারের ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ কারো নেই উল্লেখ করে এসময় মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, কারণ বিচার স্বচ্ছ হয়েছে, নিরপেক্ষ হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে। এর আগে মানবতা বিরোধী অপরাধের নামে জামায়াতে ইসলামীর প্রিয় নেতৃবৃন্দের ব্যাপারে যে বিচার হয়েছে ট্রাইব্যুনালে সেই বিচার নিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয় সারা দুনিয়াতে এটা প্রশ্নবিদ্ধ, আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। সে বিচারের বাদী সাজানো, এজহার সাজানো, মামলা সাজানো, সাক্ষী সাজানো, বিচারক সাজানো, রায় সাজানো আদালতের চত্বর থেকে সাক্ষীকে গুমের বিষয়গুলো নতুন করে উত্থাপন করেন তিনি।

কোনো একজন সরকার প্রধানের সর্বোচ্চ সাজার রায় বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এটা স্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং আপনারা দেখেছেন আমারও এই রায়ের দীর্ঘ সময় ধরে যে বিচারকরা রায় পড়েছেন সেখানে ফুটে উঠেছে যে অপরাধীরা কি পরিমাণ নিষ্ঠুর ঘৃণ প্রতিহিংসামূলক অপরাধ করেছে। তাদের পত্রপত্রিকা অডিও-ভিডিও তাদের টেলিফোনিক কনভারসেশনের যে সমস্ত তথ্য হুবহু ট্রাইব্যুনালে প্রমাণিত হয়েছে, রায়ের মধ্যে কোট আনকোট সেগুলো পড়ে শোনানো হয়েছে।

তিনি বলেন, যাদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছে, আয়না ঘরে খুন-খারাবি করে ক্রসফায়ারে বিভিন্নভাবে শেষ করা হয়েছে, পিলখানা-শাপলা চত্বর, আরও বিচার প্রক্রিয়া তো সামনে আছে এটা প্রথম রায় আমরা পেলাম সেজন্য আমরা মনে করি সবগুলোরই নিরপেক্ষ স্বচ্ছ বিচার হওয়া উচিত আজকের রায়ের মধ্য দিয়ে অন্তত ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যাদের পিতা হারিয়েছে, স্বামী হারিয়েছে, সন্তান হারিয়েছে তাদের ক্ষতির পূরণ হয়ত কোনোদিন হবে না।

এদিকে, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল নূরুল ইসলাম সাদ্দাম এক বিবৃতিতে বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় খুনি হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুনের রায়ে দেশের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা যে গণহত্যা চালিয়েছে, তার মূল মাস্টারমাইন্ড ছিল পলাতক ফ্যাসিস্ট হাসিনা। তার নির্দেশে সারা দেশে গণহত্যা চালিয়ে ১৩৩ জন শিশুসহ সহস্রাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয়।

অন্যদিকে, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের এর সাথে ইউনিসেফের প্রতিনিধি দলের মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ ইউনিসেফ বাংলাদেশ এর আমন্ত্রণে তাদের ঢাকা অফিসে ‘বাংলাদেশে শিশুদের ভবিষ্যৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সুরক্ষা ও করনীয়’ বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সভায় মিয়া গোলাম পরওয়ার এর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করেন। এ প্রতিনিধি দলে ছিলেন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন এবং জামায়াত নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ শিশির মনির। শিশুদের অধিকার নিশ্চিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে ইউনিসেফের ধারাবাহিক আলোচনার অংশ হিসেবে আয়োজিত এ সভায় ইউনিসেফের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারী দলের নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত এর রিপ্রেজেনটেটিভ রানা ফ্লাওয়ার্স। আলোচনা সভায় ইউনিসেফ বাংলাদেশ-এর শিশুদের সাম্প্রতিক অবস্থার উপর গবেষণার কিছু চিত্র তুলে ধরা হয়। গবেষণায় বলা হয়-বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে মাত্র ১৫%-২০% প্রসূতি মায়ের সিজারিয়ান ডেলিভারি (অপারেশনের মাধ্যমে শিশুর জন্ম) প্রয়োজন হয়; কিন্তু বাস্তবে, হাসপাতালে/ক্লিনিকে ৭৫% মা সিজার করতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি শুধু জনস্বাস্থ্যের জন্য সংকট নয়, বরং একটি বৃহৎ সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপও সৃষ্টি করছে।

Facebook Comments Box