দুর্ধর্ষ গ্রিলকাটা চক্র গ্রেফতার

ঘটনার মাত্র ছয় দিনের মধ্যে পুরো দস্যুচক্রকে চিহ্নিত করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গ্রেফতার করেছে রাজধানীর রামপুরা থানা পুলিশ। এ সময় তাদের কাছে থাকা গলিত স্বর্ণসহ মোট ৭ ভরি স্বর্ণ, নগদ ৫০ হাজার টাকা, দস্যুতায় ব্যবহৃত তিনটি চাপাতি ও একটি হাইড্রোলিক স্টিল কাটার (গ্যাস কাটার) উদ্ধার করে পুলিশ। অপরাধীরা জানায়, বিলাসী জীবনের ব্যয় সামলাতে তারা এ পথ বেছে নিয়েছে।

বৃহস্পতিবার পুরো চক্রটিকে চিহ্নিত ও গ্রেফতার করতে সক্ষম হয় রামপুরা থানা পুলিশ। স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও ভাড়াটে সদস্য মিলিয়ে চক্রের মোট সক্রিয় সদস্য ৫ জন। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলো- রমজান, আরমান, বিল্লাল, রাসেল এবং সালমান।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর রামপুরায় নিজের বাসায় ঘুমিয়েছিলেন ভাগিনাসহ বৃদ্ধ স্বামী-স্ত্রী। ভোর ৪টার দিকে হঠাৎ শব্দ পেয়ে ঘুম ভাঙে ভাগিনা সিয়ামের। বাসায় চুরি হচ্ছে বুঝতে পেরে প্রতিরোধ করে সে। চক্রের দুজনকে প্রায় কাবু করে ফেলে সে; কিন্তু ততক্ষণে সহযোগী আরও দুজন দস্যু এসে ধারালো চাপাতির মুখে তাকে জিম্মি করে বাসার সবার হাত-পা বেঁধে ফেলে। জীবননাশের হুমকি দিয়ে লুটে নেয় ৩০ ভরি স্বর্ণ, নগদ ১ লাখ টাকা ও একটি ল্যাপটপ। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে তাদের এ তাণ্ডব।

পরে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে রেখে কাটা গ্রিল দিয়েই পালিয়ে যায় চক্রের সবাই। কোনোমতে নিজেকে মুক্ত করতে পেরে ৯৯৯-এ কল দেন ভুক্তভোগীরা। খবর পেয়ে ছুটে আসে পুলিশ। ঘটনার অনুসন্ধান, আসামি গ্রেফতার ও মালামাল উদ্ধারে তৎপর হয় পুলিশ।

বিভিন্ন উপায়ে তথ্যসংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শেষে প্রথমে রাজধানীর পশ্চিম রামপুরা থেকে গ্রেফতার করা হয় অভিযুক্ত রমজানকে। তার দেওয়া তথ্যমতে, নিজ বাড়ি কুমিল্লা মুরাদনগর থেকে গ্রেফতার করা হয় মূল পরিকল্পনাকারী আরমানকে।

পরে দুজনের দেওয়া তথ্যে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মিজমিজি এলাকা থেকে গলিত স্বর্ণসহ গ্রেফতার করা হয় স্বর্ণকার বিল্লাল হোসেনকে। রাসেলকে আটক করা হয় রংপুর জেলা থেকে। আর চক্রের ভাড়াটে সদস্য সালমানকে গ্রেফতার করা হয় রাজধানীর উত্তর বাড্ডার সাতারকুল এলাকা থেকে। এ সময় তাদের কাছ থেকে আনুমানিক ৫ ভরি গলানো স্বর্ণ, এক জোড়া চুড়ি ও দুটি আংটিসহ মোট ৭ ভরি স্বর্ণ, নগদ ৫০ হাজার টাকা এবং দস্যুতায় ব্যবহৃত তিনটি চাপাতি ও একটি হাইড্রোলিক স্টিল কাটার (গ্যাস কাটার) উদ্ধার করা হয়।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুসন্ধান করে জানা গেছে, এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন থানায় বিভিন্ন অপরাধের দায়ে একাধিক মামলা রয়েছে। মূল পরিকল্পনাকারী আরমানের বিরুদ্ধে দুটি অস্ত্র আইনের মামলাসহ মোট সাতটি মামলা রয়েছে। এর আগেও বহুবার আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবার জামিনে বের হয়ে এসে পুনরায় একই কাজ শুরু করে। সর্বশেষ ২০২৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর জেল থেকে জামিনে ছাড়া পায়।

রাসেলের বিরুদ্ধে চুরি, ডাকাতি ও দস্যুতা মিলিয়ে তিনটি মামলা রয়েছে। রমজান ও সালমানের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে।

অন্যদিকে প্রায় অর্ধযুগ ধরে চোরাই স্বর্ণ বেচাকেনার সাথে যুক্ত স্বর্ণকার বিল্লাল হোসেন। এ পর্যন্ত বহুবার আদালতে সোপর্দ হয়ে জামিনে বেরিয়ে আসেন। শাস্তিও হয় কয়েকটি মামলায়। তবুও ছাড়তে পারেনি এ পেশা। মূলত তার আশপাশের কয়েক জেলার চোরাই স্বর্ণের শেষ গন্তব্য হয় তার দোকান ‘আলিফ জুয়েলার্স’-এ। এখানে সে স্বর্ণকে গলিয়ে নিরাপদে পরবর্তী পাচারকারীদের কাছে হস্তান্তর করে।

বিলাসবহুল জীবন অনুসরণ আর নিজেদের অর্থনৈতিক বেহিসাবি ভাব বজায় রাখতেই তারা এ পথে পা বাড়িয়েছে বলে জানায়। আসামি সালমান জানায়, বিভিন্ন সময়ে জুয়ায় হেরে গিয়ে টাকা পরিশোধের জন্য সে এ পথে পা বাড়িয়েছে।

খিলগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার রাশেদুল ইসলাম জানান, স্বর্ণকার বিল্লাল হোসেনসহ চক্রের প্রতিটি সদস্যের রয়েছে নিজস্ব নেটওয়ার্ক। টার্গেটে হিট দেওয়ার প্রয়োজন অনুযায়ী তারা সময়ে সময়ে লোক ভাড়া করে নেয়। ডাকাতি-দস্যুতায় প্রাপ্ত মালামাল নিরাপদে বিক্রি করে দেওয়ার জন্যও তারা ব্যবহার করে এসব লোকদের।

তবে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের পর বাকিদের চিহ্নিত করে শিগগিরই আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

Facebook Comments Box