নিজস্ব প্রতিবেদক
নারায়ণ সিটি করপোরেশনের ৭ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডে নিকাহ রেজিস্ট্রার নিয়োগ নিয়ে ভয়াবহ জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য, ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিসহ নানা জালিয়াতির মাধ্যমে পছন্দের দুইজনকে নিয়োগ দেয়ার চক্রান্ত চলছে। নারায়ণ সিটির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী মাছিহুর রহমানের নেতৃত্বে চলমান এসব জালিয়াতিতে সহযোগিতা করছেন খোদ আইনমন্ত্রণালয় ও নারায়ণ জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের কয়েকজ জন কর্মকর্তা। এরইমধ্যে জালিয়াতির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে দুদকের পক্ষ থেকে আইন সচিবকে চিঠি দেয়া হয়েছে। এছাড়া নিয়োগের ভুয়া প্যানেল বাতিল করার জন্য আইনমন্ত্রী ও সচিবকে চিঠি দিয়েছেন বঞ্চিতরা।
অভিযোগ মতে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৭ ও ৯ নং ওয়ার্ডে নিকাহ্ রেজিস্ট্রার নিয়োগের জন্য জেলা রেজিষ্টার নারায়নগঞ্জ ২০২০ সালে ২২ জানুয়ারি ১০৭নং স্বারকে একটি মতামত চেয়ে আইন বিচার সংসদ বিষয়ক মন্ত্রনালয়ে পত্র প্রেরন করেন, কিন্তু মতামতের জবাবের অপেক্ষা না করে জেলা রেজিস্ট্রার, নারায়ণগঞ্জ গত ৮ মে ৪৫৬ নং স্মারকে আইন মন্ত্রণালয়ে প্যানেল প্রেরণ করেন। ওই প্যানেলটি মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ যথাযথভাবে অনুসরণপূর্বক প্রস্তুত করা হয়নি।
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এর বিধি ও (৩) উল্লেখ রয়েছে যে, “উপ-বিধি (২) এর অধীন দরখাস্ত আহবানের নোটিশ উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা কমিটির সকল সদস্যের দপ্তরের নোটিশ বোর্ডে অথবা দৃষ্টিগ্রাহ্য অন্য কোন স্থানে বিজ্ঞপ্তি সাঁটিয়া উহা জারি করিতে হইবে এবং কোন উপদেষ্টা বা সদস্যের নিজস্ব দপ্তর না থাকিলে উক্ত সদস্যকে বিজ্ঞত্তির একটি কপি প্রদান করিতে হইবে”। কিন্তু জেলা রেজিস্ট্রার, নারায়ণঞ্জ কর্তৃক প্রকাশিত নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা কমিটির সকল সদস্যের দত্তরের নোটিশ বোর্ডে অথবা দৃষ্টিগ্রাহ্য অন্য কোন স্থানে সাঁটানো হয়নি। এ বিষয়ে অভিযুক্ত জেলা রেজিস্ট্রার ও জেলা রেজিস্ট্রারের অফিসের সহকারী আবু রায়হান বাবুর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দৈনিক প্রত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়।
এছাড়া নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৭ ও ৯ নং ওয়ার্ডে নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের অধিক্ষেত্র সংক্রান্ত বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগে কনটেম্পট পিটিশন নং-২০১/২০১৩ (রীট পিটিশন নং ৭৩৬০/২০১১ হতে উদ্ভূত) বিচারাধীন থাকা সত্তে¡ও প্যানেল প্রস্তুত করা হয়েছে, যা আদালত অবমাননার শামিল।
সূত্রমতে, জেলা রেজিস্ট্রার কর্তৃক ৭ নং ওয়ার্ডের জন্য প্রেরিত প্যানেলের এক নম্বর ক্রমিকধারী মুহাম্মদ মাঈনুর রহমান এর আগে ২০১৩ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের এক নম্বর ওয়ার্ডে নিকাহ্ রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি জালজালিয়াতির আশ্রয় গ্রহণ করে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৭ নং ওয়ার্ডের নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের অস্থায়ী লাইসেন্স সৃজন করেছেন; যার তারিখ ১৯/১১/২০১৩ স্মারক নং-বিচার- ৭/২এন-৩৭/২০১২ (অংশ-২)-১৬০৯। ওই জালিয়াত সংক্রান্ত লাইসেন্সের আলোকে তিনি নিকাহ্ রেজিস্ট্রি কাজে যোগদানের জন্য একাধিকবার জেলা রেজিষ্ট্রার, নারায়ণগঞ্জ বরাবর আবেদন পত্র দাখিল করেছেন। অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৭ নং ওয়ার্ডের জন্য প্রস্তুতকৃত প্যানেলের ১ নং ক্রমিকধারী প্রার্থী মাঈনুর রহমান কখনও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ১ নং ওয়ার্ডের নিকাহ্ রেজিষ্টার হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য আবেদন: কখনও ৭ নং ওয়ার্ডের নিকাহ্ রেজিস্ট্রার দাবি করে ইনডেন্ট পাশের জন্য আবেদন; পরবর্তীতে আবার ৭ নং ওয়ার্ডের নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের প্রস্তুতকৃত প্যানেলের ১ নং ক্রমিকধারী প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি খুবই রহস্যজনক। এতে স্পষ্ট হয় যে, জেলা রেজিস্ট্রার কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্যানেলটি সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই প্রস্তুত করা হয়েছে।
জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৭, ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডটি পূর্বে গোদনাইল ইউনিয়নের অন্তর্ভূক্ত ছিল। মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ অনুযায়ী কোন ইউনিয়ন সিটি কর্পোরেশনে অন্তর্ভূক্ত হলে পূর্বের নিয়োগপ্রাপ্ত নিকাহ্ রেজিস্ট্রারকে তার বাসিন্দা অনুযায়ী সিটি কর্পোরেশনের ওয়ার্ডে গণ্য করার পর অবশিষ্ট ওয়ার্ডে নতুন নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের প্যানেল প্রস্তুত করতে হবে। কিন্তু গোদনাইল ইউনিয়নের নিকাহ্ রেজিস্ট্রার নাজমুল ইসলামকে কোন ওয়ার্ডে বহাল না রেখেই ৭ ও ৯নং ওয়ার্ডের প্যানেল প্রস্তুত করা হয়েছে। প্যানেল প্রস্তুতের পর মো: নাজমুল ইসলামকে গত ১৪ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৮ নং ওয়ার্ডের নিকাহ্ রেজিস্ট্রার হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা উক্ত বিধিমালার পরিপন্থী।
এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৭ ও ৯ নং ওয়ার্ডের নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের অধিক্ষেত্র সংক্রান্ত বিষয়ে রীট পিটিশন নং ৭৩৬০/২০১১, কনটেম্পড অব কোর্ট ১৭৫৯/২০১৩ এবং আপীল বিভাগে ১৭৫৯/২০১৩ নং মোকদ্দমা বহাল থাকায়; মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ অনুসরণ না করেই প্যানেল প্রস্তুত করায় এবং জেলা রেজিস্ট্রার কর্তৃক প্রকাশিত ২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর ১০৩৪ (৮) নং স্মারকে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিলের জন্য জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করা হলে এ বিষয়ে দুদক মহাপরিচালক ১৩ এপ্রিল ১৪৯৫৯ নং স্মারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন ও বিচার বিভাগের সচিব বরাবর তা প্রেরণ করেন।
এছাড়াও গত ২২ জানুয়ারি এ অভিযোগের বিষয়ে আইনমন্ত্রী ও আইচ সচিব বরাবর আবেদন করেন এক ভুক্তভোগী। তবে অভিযোগ পত্রগুলো বিচার শাখা-৯ এর প্রশাসনিক কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ও উপ-সচিব (রেজিঃ) এর পিএ ফয়সাল আহম্মেদ অতি গোপনে এবং যোগসাজশে তা সরিয়ে রেখে ফাইলে উপস্থাপন না করে সু-কৌশলে নথি উপস্থান করেন।
অভিযোগ মতে, নারায়ণগঞ্জ সিটির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মাছিহুর রহমানের আপন ভাই মাঈনুর রহমান। তার আরেক ভাই মাহবুবুর রহমান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৬৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার। ভুয়া নিয়োগ প্রক্রিয়া সৃজন করে হাইকোর্টে রিট করার অপরাধে মাহবুবুর রহমানকে এক লাখ টাকা জরিমান এবং সঠিক প্যানেলভুক্ত এক নম্বর নামধারী ব্যক্তিকে এক মাসের মধ্যে নিয়োগ প্রদানের নির্দেশ প্রদান সত্তে¡ও আইন মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা-৭ এর প্রশাসনিক কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম ইসলাম ও উপ সচিবের পিএ ফয়সাল আহমেদের যোগসাজসে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ রাখা হয়েছে। গত ২৪ মে হাইকোর্টের দেয়া রায় পরবর্তীতে ১২ জুন চেম্বার জজ বহাল রাখেন। এরপরও ভুয়া প্যানেল থেকে নিয়োগের জন্য তৎপরতা চালাচ্ছে জালিয়াতি চক্র।
এ অবস্থায় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ৭ ও ৯ নং ওয়ার্ডের জন্য প্রেরিত ভুয়া প্যানেল বাতিলসহ ওই প্যানেল হতে নিকাহ্ রেজিস্ট্রার নিয়োগ না দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহবান জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও বঞ্চিতরা।
















