শ্রমিকদের সব বিষয় মালিকদের উপর ঠেলে দেবে না

দীর্ঘদিন ফ্যাসিজমের যাতা কলে পিষ্ট বাংলাদেশ চব্বিশের বৈপ্লবিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুক্তি পেয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন, জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, এই আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ ও জীবন দেওয়া লোকদের শতকরা ৬২ ভাগ হচ্ছেন শ্রমিক। আর আমরা বাকি সবাই মিলে ৩৮ ভাগ। এটি পৃথিবীর ইতিহাস। শ্রমিকদের সব বিষয় মালিকদের উপর ঠেলে না দিয়ে রাষ্ট্রকেও দায়িত্ব নিতে হবে। মালিকরা ইনসাফের ভিত্তিতে তাদের যা করণীয় তা করবে। বাকিটা রাষ্ট্রকে শেয়ার করতে হবে। শনিবার রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের ‘ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলন-২০২৬’ এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে একথা বলেন তিনি। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সদ্য বিদায়ী কেন্দ্রীয় সভাপতি ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আ ন ম শামুসল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, সেক্রেটারি জেনারেল ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ও বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান।

মালিকের ছেলে মালিক হলে, রাজার ছেলে রাজা হলে, শ্রমিকের ছেলে কেন মালিক প্রধানমন্ত্রী হবে না- এমন প্রশ্ন তুলেছেন ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমার একজন শ্রমিক ভাইয়ের ছেলে কি প্রধানমন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে কোনো নিষেধাজ্ঞা আছে? নাই। আমরা চাই শ্রমিক ভাই বন্ধুটির ঘর থেকে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী বের হয়ে আসুক। সেই শিক্ষা, সেই পরিবেশ সরকারকে রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, ইসলামের ইতিহাসেও শ্রমিকদের ভূমিকা ও অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মক্কার জীবনে ওই বঞ্চিত শ্রমিকরাই প্রথমে নবী করীম ( সা.) দক্ষিণ হস্ত হিসেবে বুক টান করে দাঁড়িয়েছিলেন। কোনো নির্যাতন তাদেরকে ঈমান থেকে খারিজ করতে পারেনি। তারা ঈমানের পথে অটল ছিলেন অবিচল ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধেও একই ঘটনা। ৯০-এর গণআন্দোলনেও একই ঘটনা, চব্বিশের গণআন্দোলনেও একই ঘটনা। অথচ রাষ্ট্রের কাছে শ্রমিক সমাজের প্রত্যাশা, দাবি ও চাহিদা খুবই মামুলি। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই সামান্যটুকু চাহিদাও তাদের এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা কোনো সরকারই পরিপূরণ করতে পারেনি।

তিনি বলেন, যারা রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় যান তারা ওই শ্রমিকদের অঙ্গ থেকে উঠে আসেননি। তারা সোনার চামচ রুপার কাঠি হাতে নিয়ে জন্ম নিয়েছেন। তারা শ্রমিকদের দুঃখ বুঝবে কীভাবে? তাদের বেশিরভাগ ব্যবসায়ী মালিক। ব্যবসায়ী মালিক হওয়া কোনো অপরাধ নয়। ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান খোলা হবে, মিল, ফ্যাক্টরি, ইন্ডাস্ট্রি চালু হবে। জনগণ সেখানে কর্মসংস্থান খুঁজে পাবে। কিন্তু তারা ওই জনগণকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানবিক মর্যাদাটুকু দিতে ব্যর্থ। তাদের এই নোংরা আচরণের কারণেই রাষ্ট্রীয় দায়িত্বেও যখন যান তখন একই কাণ্ডকারখানা তারা করে। শ্রমিকদের প্রতি তারা সম্মান দেখাতে ব্যর্থ হন।

শ্রমঘন এলাকায় কোনো বিশেষায়িত হসপিটাল নেই উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, দুই একটা সাধারণ হাসপাতাল থাকলেও সেগুলা চাহিদার তুলনায় কিছুই না। আমরা দাবি করবো, শ্রমঘন এলাকাগুলাতে অবশ্যই মানসম্মত সাধারণ হাসপাতাল যেমন থাকবে তেমন বিশেষায়িত হাসপাতালও সরকারকে গড়ে তুলতে হবে। শ্রমিকদের চিকিৎসা সংগতভাবেই এর ব্যয়ভার সরকার এবং মালিক পক্ষকে শেয়ার করে বহন করতে হবে। কারণ শ্রমিকদেরকে যা বেতন ভাতা দেওয়া হয় তা দিয়ে পেটের যোগানই হয় না, চিকিৎসার খরচ বাঁচাবে কোত্থেকে? পাশাপাশি শ্রমিকদের সন্তানদেরকে মানুষ করা শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব পরিপূর্ণভাবে শুধু সরকারকেই নিতে হবে।

এদিকে, শনিবার রাজধানীর খামারবাড়ি কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে (কেআইবি) ‘বাংলাদেশের কৃষিতে বিশ্ব জ্বালানি সংকটের প্রভাব উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, বিদেশি ঋণ আর সহায়তা এই জাতিকে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে দেবে না। তিনি বলেন, সম্প্রতি অতীত থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত। পাপ তার বাপকেও ছাড়ে না। ক্ষমতা মানুষকে অন্ধ করে দেয়, এইজন্য সমাজকে আর দেখেনা। আসুন আমরা ট্রান্সপারেন্সি গ্লাস দিয়ে সমাজটাকে দেখি। সমাজের মানুষের হাহাকার বোঝার চেষ্টা করি।

কৃষি বাঁচলে, দেশ বাঁচবে এটা যেন আমরা ভুলে না যাই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাজে যার যেখানে গুরুত্ব পাওয়া উচিত, তাকে ততটুকুই দিতে হবে। কৃষি আমাদের প্রধান, কৃষি আমাদের দ্বিতীয়, কৃষি আমাদের তৃতীয়। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জ্বালানি ছাড়া আমাদের কোনো চাকাই চলবে না। সব অচল। ড. মিজান সাহেব বলেছেন জ্বালানির একটা অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইমপোর্ট করি। আমাদের নিজেদের সক্ষমতা রয়েছে বিশেষ করে পেট্রোল এবং অকটেনের ক্ষেত্রে শতকরা ৫০ %ভাগ।

তিনি বলেন, আল্লাহ অফুরন্ত সম্পদ রেখেছেন আমাদের এখানে। কিন্তু আমরা পারছি না। আমাদের এক্সপার্ট নেই। আমাদের সম্পদ যেন আমরাই তোলার ব্যবস্থা করতে পারি তারও কোনো উদ্যোগ নেই। জামায়াতের আমির বলেন, দেখিয়েছেন জ্বালানি মজুদ আছে। কিন্তু সাইনবোর্ডে লেখা জ্বালানি নেই। তেল নেই। পরে আবার ধরা পরছে। এদিকে জাতিসংঘ থেকে বলা হচ্ছে যদিও যুদ্ধ থামে তার প্রভাব কয়েক মাস চলবে বিশ্ব অর্থনীতিতে। আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন এএফবির সভাপতি কৃষিবিদ ড. এটিএম মাহবুব-ই ইলাহী (তাওহীদ)। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন— এএফবির মহাসচিব কৃষিবিদ শেখ মুহাম্মদ মাসউদসহ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

Facebook Comments Box