আবু সিদ্দিক, ভোলা প্রতিনিধি:
ভোলার চরফ্যাশনের বেতুয়া–ঢাকা নৌপথে লঞ্চ চলাচলে মালিকপক্ষের চালু করা রোটেশন পদ্ধতির কারণে যাত্রী ভোগান্তি বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী লঞ্চ চলাচল না করায় কেবিন সংকট, টিকিট সংগ্রহে বিড়ম্বনা এবং প্রয়োজনের সময় যাতায়াত করতে না পারার অভিযোগ করছেন যাত্রীরা। এ পরিস্থিতিতে রোটেশন পদ্ধতির আইনগত ভিত্তি প্রকাশ এবং জনস্বার্থবিরোধী হলে তা বাতিলের দাবি উঠেছে। এ নিয়ে আইনি নোটিশ পাঠানোর পর এবার হাইকোর্টে মামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বেতুয়া–ঢাকা নৌপথে এমভি কর্ণফুলী, এমভি টিপু ও এমভি তাসরিফ নামের তিনটি লঞ্চ চলাচল করে। এসব লঞ্চের জন্য বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী রুট পারমিট নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। শুরুতে কয়েক মাস নির্ধারিত সূচি অনুসরণ করে লঞ্চ চলাচল করলেও পরে মালিকপক্ষের পারস্পরিক সমঝোতায় রোটেশন পদ্ধতি চালু করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, বিআইডব্লিউটিএর নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ না করে মালিকপক্ষ নিজেদের সুবিধামতো লঞ্চ চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। রোটেশন পদ্ধতির কারণে কোনো কোনো দিন একটি কোম্পানির লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের বিকল্প কমে যাচ্ছে। এতে প্রয়োজনের সময় লঞ্চ না পাওয়া, কেবিনের টিকিট সংগ্রহে অনিশ্চয়তা এবং অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের মতো পরিস্থিতির মুখে পড়ছেন তাঁরা।
যাত্রীদের প্রশ্ন, প্রচলিত আইন, বিধিমালা কিংবা সরকারি আদেশের ভিত্তিতে রোটেশন পদ্ধতি চালু করা হয়ে থাকলে তার সুনির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হচ্ছে না কেন? তাঁদের দাবি, এ ব্যবস্থার বৈধতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী লঞ্চ চলাচল ও প্রতিযোগিতামূলক যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে হবে।
চরফ্যাশন পৌরসভার মো. কামরুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিনের সময়সূচি অনুযায়ী তিনটি কোম্পানির লঞ্চ চলাচলের কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না বলে তাঁদের অভিযোগ। রোটেশন পদ্ধতি যাত্রীসেবা নিশ্চিত করার জন্য, নাকি যাত্রীদের বিকল্প সীমিত করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরির জন্য সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
কামরুল ইসলামের অভিযোগ, নির্ধারিত কেবিনের বরাদ্দ শেষ হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মুঠোফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরে বাধ্য হয়ে লঞ্চের স্টাফদের জন্য নির্ধারিত ছোট কেবিন অতিরিক্ত টাকা দিয়ে বুকিং করতে হয়। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট লঞ্চ কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আছলামপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা জাহিদ ইসলাম বলেন, বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেও কেবিন বুকিং করতে না পারায় দীর্ঘ সরকারি ছুটিতেও পরিবার নিয়ে বাড়ি ফিরতে পারেননি তিনি। যাত্রীদের এমন ভোগান্তি নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
অন্যদিকে, লঞ্চমালিকপক্ষের দাবি, পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ভোলা–বরিশাল হয়ে সড়কপথে ঢাকায় যাতায়াতকারী যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। এতে নৌপথে যাত্রী কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ। যাত্রী কমে যাওয়ায় লঞ্চ পরিচালনায় লোকসানের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিচালন ব্যয় সামাল দিতেই রোটেশন পদ্ধতি চালু রাখা হয়েছে বলে মালিকপক্ষের বক্তব্য।
স্কুলশিক্ষক কামাল হোসেন বলেন, লঞ্চমালিকদের ব্যবসায়িক স্বার্থের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নির্বিঘ্নে যাতায়াতের অধিকারও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। যাত্রীসংকট ও লোকসানের বিষয়ে মালিকপক্ষের দাবিগুলো যাচাই করা যেতে পারে। তবে সেই সংকটের দায় যেন সাধারণ যাত্রীদের বহন করতে না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। অভিযোগগুলো তদন্ত করে সরকার ও বিআইডব্লিউটিএকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে, বেতুয়া–ঢাকা নৌপথে রোটেশন পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে জনস্বার্থে প্রায় এক মাস আগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল বাছেদ শামীম আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন বলে জানা গেছে। নোটিশে রোটেশন পদ্ধতির কারণে প্রতিযোগিতামূলক যাত্রীসেবা বাধাগ্রস্ত হওয়া, যাত্রী ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি এবং নৌযান চলাচলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে।
আইনজীবী আব্দুল বাছেদ শামীম বুধবার (২১ অক্টোবর) কান্ট্রি বিডি ডট কম’কে বলেন, ছুটির পর এ বিষয়ে মামলা করবেন তিনি। অন্যদিকে, রোটেশন পদ্ধতি বাতিলের দাবিতে ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য নুরুল ইসলাম নয়নের দৃস্টি কামনা করছেন ভুক্তভোগীরা।
চরফ্যাশন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামাল গোলদার বলেন, লঞ্চমালিকেরা জনগণের দাবি না মানলে এ ব্যবস্থার প্রতিবাদে চরফ্যাশন সদর রোডে সর্বস্থরের জনসাধারণ’কে নিয়ে মানববন্ধন করা হবে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, বেতুয়া–ঢাকা নৌপথে রোটেশন পদ্ধতির আইনগত ভিত্তি ও কার্যকারিতা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। যাত্রীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী লঞ্চ চলাচল নিশ্চিত করা গেলে এ নৌপথে ভোগান্তি কমবে বলে মনে করছেন তাঁরা।












