মনোহরদীতে ইউপি নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থীরাই আ.লীগের পথের কাঁটা

নরসিংদী জেলার মনোহরদীতে আজ বুধবার (১৫জুন) অনুষ্ঠিত হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন। উপজেলার কৃষ্ণপুর, চরমান্দালিয়া ও খিদিরপুর এই তিনটি ইউনিয়নে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এরইমধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংিসতার মধ্যদিয়ে গত সোমবার মধ্যরাত থেকে শেষ হয়েছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারনা। নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে গিয়ে প্রতিটি ইউনিয়নেই নৌকা ও স্বতন্ত্র-বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থীদের কর্মী সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এই জেরের মধ্যেদিয়ে এখনো থমথমে উত্তেজনা বিরাজ করছে প্রতিটি এলাকায়। কখনো কখনো এ উত্তেজনা রুপ নিচ্ছে সংঘর্ষে। এপর্যন্ত প্রতিটি ইউনিয়নেই ছোট বড় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীর জীবন নিয়ে শঙ্কা: নিজের ও নেতাকর্মীদের জীবন বাঁচাতে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টির দাবি জানিয়ে এলাকা ছেড়ে ঢাকায় এসে সংবাদ সম্মেলন করেছেন ইউপি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আনিছ উদ্দিন শাহীন। নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার চরমান্দালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সন্ত্রাসী হামলায় তার বাড়িঘর ভাঙচুর করার অভিযোগ করেছেন তিনি। সেখানে প্রাণঘাতী রক্তাক্ত ঘটনার শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

তিনি নিজের জীবন নিয়েও শঙ্কায় আছেন। অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তিনি। গত ৬জুন দুপুরে রাজধানীর ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশন (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রার্থী মো. আনিছ উদ্দিন শাহীন এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার চরমান্দালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আনারস প্রতীকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছি।

প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই প্রতিপক্ষ প্রার্থী আ. কাদির তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে নানাভাবে আমার প্রচার প্রচারণায় বাধা দিচ্ছে। আমার প্রচারকর্মীদের মারধর করছে, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে। এমনকি নিজেরা মিথ্যা হামলার নাটক সৃষ্টি করে আমার নেতাকর্মীদের নামে একের পর এক মিথ্যা মামলা দিয়ে যাচ্ছে। আমি অত্র ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে মানুষের সুখে-দুখে সবসময় পাশে ছিলাম।

আমার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে আমাকে পরাজিত করার জন্য অগণতান্ত্রিক ভয়ঙ্করপন্থা বেছে নিয়েছে। এরআগে গত ২৮ মে মনোহরদীর চরমান্দালীয়া ইউনিয়নে দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সৃষ্ট এক সংঘাতে ১৫ কর্মী সমর্থক আহত ও ১০ হোন্ডা ভাংচুর ঘটে। ওইদিন রাতে চরমান্দালীয়া ইউপির নৌকার প্রার্থী ও এক বিদ্রোহী প্রার্থীর মধ্যে এ সংঘাতের ঘটনা ঘটে। ইউনিয়নের সমেদ চান্দের বাজার সংলগ্ন স্থানে নৌকা প্রার্থী আব্দুল কাদির ও স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রতিপক্ষ আনিস উদ্দীন শাহীনের সমর্থকদের মধ্যে এ সংঘাত ঘটেছে। এতে ৪ টি ককটেল বিস্ফোরিত হয় ও বৈঠা দা লাঠিসোটা নিয়ে পরস্পর পরস্পরের উপর ঝাপিয়ে পড়ে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহীনের কর্মী সমর্থকদের অভিযোগ, তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানস্থলে নৌকা প্রার্থী আব্দুল কাদিরের সমর্থকরা হামলা চালিয়েছেন। এতে তাদের ১৫ কর্মী সমর্থক আহত ও কমপক্ষে ১০ টি হোন্ডা ভাংচুর হয়েছে।

নৌকার প্রার্থী ও চরমান্দালীয়া ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান আব্দুল কাদির এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবী,তার কর্মী সমর্থকদের উপর বিদ্রেহী প্রার্থী শাহীনের লোকজন ৪ টি ককটেলের বিস্ফোরন ঘটিয়ে সংঘর্ষের সূচনা করেছে। কোন নিরপেক্ষ মহল থেকে বিষয়গুলো যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবদুল কাদির নদী খননের নামে বালু উত্তোলনসহ নানা অনিয়ম ও গুরুতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ এলাকাবাসির। মানুষের ঘরে ঘরে গিয়ে সেবা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আবদুল কাদের এলাকায় হয়ে উঠেছেন মূর্তিমান আতঙ্ক। অস্ত্র ও মাদক বাণিজ্য,বালুদস্যুতাসহ বিভিন্ন প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন তিনি।

পুলিশের গাড়ি, নির্বাচনী কার্যালয় ও মাইক ভাঙচুর: গত ৭ জুন নরসিংদীর মনোহরদীতে ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গাড়ি, নির্বাচনী কার্যালয় ও প্রচার মাইক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এতে হামলায় ৩ পুলিশ সদস্যসহ কমপক্ষে ১২ জন আহত হয়েছেন। আহত পুলিশ সদস্যরা হলেন উপপরিদর্শক (এএসআই) শহিদুজ্জামান, এটিএসএআই সোহেল পারভেজ ও কনস্টেবল আবু নাইম বিন হুদা। এ ঘটনায় পুলিশের পক্ষ থেকে ২৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও শতাধিক লোকের নামে মামলা করা হয়েছে। খিদিরপুর ইউনিয়নে নির্বাচনে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান জামিলের (আনারস) উঠান বৈঠকে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে নৌকার প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরদ্ধে।

ওইদিন সন্ধ্যায় ৫ নং ওয়ার্ডের মুজিবুর শেখের বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে। হামলায় জামিলসহ কয়েকজন সমর্থক ও নেতাকর্মী আহত হন। ভাংচুর করা হয় তিনটি মোটরসাইকেল এবং ২৫ টি চেয়ার। হামলার বিচার চেয়ে পুলিশ সুপারেরর কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন আনারস প্রতীকের প্রার্থী মাহবুবুর রহমান জামিল। লিখিত অভিযোগে তিনি জানান, সোমবার সন্ধ্যার দিকে মুজিবুর শেখের বাড়ীতে পূর্ব নির্ধারিত উঠান বৈঠক চলছিল। এসময় নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী রমিজ উদ্দিন, তার মেয়ে উম্মে হানি লাবনী এবং ছেলে আব্দুর রব সজিব নেতৃত্বে ২০-২৫ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত হয়ে গালাগাল শুর করে এবং বৈঠক বন্ধ করার হুমকী দেয়। এসময় তাদেরকে গালাগাল না করার অনুরোধ করলে তারা লাঠিসোটা দিয়ে আমাকেসহ কয়েকজন কর্মী-সমর্থকদের বেদম মারপিট করে। তাছাড়া আমাদের ব্যবহৃত তিনটি মোটরসাইকেল এবং ২৫-৩০টি প্লাষ্টিকের চেয়ার ভেঙ্গে ফেলে।

কৃষ্ণপুর ইউপির বীরগাঁও চৌরাস্তা বাজারে হামলা: ১৭ মে মনোহরদীতে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন ঘিরে নৌকা সমর্থকদের ওপর হামলা চালিয়েছে প্রতিপক্ষের লোকজন। এতে ১৫ থেকে ২০ জন আহত হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে একটি মাইক্রোবাস, পাঁচটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা, তিনটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা এবং ১০টি মোটরসাইকেল। গত ১৭ মে রাতে মনোহরদী উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের বীরগাঁও চৌরাস্তা বাজারে এ ঘটনা ঘটে। পরে অর্ধশতাধিক লোকের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন কৃষ্ণপুর ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান এমদাদুল হক আকন্দ। এ বিষয়ে এমদাদুল হক আকন্দ বলেন, ১৭ মে বিকেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে নৌকা প্রতীকের মনোনীত প্রার্থীর চিঠি পেয়ে এলাকায় ফিরছিলাম।এ খবর পেয়ে কর্মী-সমর্থকরা মোটরসাইকেল, সিএনজি ও অটোরিকশা নিয়ে মনোহরদী বাসস্ট্যান্ড থেকে আমাকে নিতে আসে।

পথে বীরগাঁও চৌরাস্তা মোড়ে পৌঁছলে কৃষ্ণপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মাহবুবুর রহমান দুলালের নেতৃত্বে অন্তত ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র ও ইটপাটকেল নিয়ে আমার সমর্থকদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। আহতরা মনোহরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিয়েছে।

Facebook Comments Box