তৃতীয়বারের নির্বাচনে কে হচ্ছেন কুমিল্লার নগর পিতা? সদ্য বিদায়ী মেয়র মনিরুল হক সাক্কু নাকি আরফানুল হক রিফাত? এই প্রশ্নের হিসাব খুঁজতে মরিয়া কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ভোটার ও রাজনীতি সচেতনরা। তবে সবকিছুই জানা যাবে বুধবার (১৫ জুন) সন্ধ্যার পর। দিনভর ভোট শেষে ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে নগরবাসীকে। তবে বেশ কিছু হিসাব-নিকাশ কষছেন নগরবাসী ও রাজনীতি সচেতনরা।
২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের (কুসিক) প্রথম নির্বাচনে ৩০ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন মনিরুল হক সাক্কু। নির্বাচনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রয়াত বর্ষীয়ান নেতা অধ্যক্ষ আফজল খান। এটিএম শামসুল হুদা কমিশনের আমলে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৫ শতাংশ। যদিও ওই সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ছিল, তবু বিএনপি ইভিএমের বিরোধিতা করে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন। পরে মনিরুল হক সাক্কু দল থেকে পদত্যাগ করে ইভিএমের মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।
অন্যদিকে আফজল খানকে আওয়ামী লীগ সমর্থন দিলেও মেয়র পদে দলটির আরও দুই নেতা নির্বাচনে অংশ নেন। তারা হলেন- নূর উর রহমান মাহমুদ তানিম এবং আনিসুর রহমান মিঠু। ফলে তিনি আর নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে পারেননি। জয়ের হাসি হাসেন মনিরুল হক সাক্কু।
২০১৭ সালের কুসিক নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয় ব্যালট পেপারের মাধ্যমে। সেই নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। দলটি থেকে ধানের শীষ প্রতীকে মেয়র প্রার্থী হন মনিরুল হক সাক্কু। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন প্রথম নির্বাচনে পরাজিত আফজল খানের কন্যা আঞ্জুম সুলতানা সীমা। ২০১৭ সালের ৩০ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনেও জয় হয় সাক্কুর। ধানের শীষ প্রতীকে সাক্কু পান ৬৮ হাজার ৯৪ ভোট। আঞ্জুম সুলতানা সীমা পেয়েছিলেন ৫৭ হাজার ৮৬৩ ভোট। এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৬৩.৯২ শতাংশ।
পরপর দুটি নির্বাচনে জয়লাভের পর কুমিল্লা নগরীকে সাক্কুর দূর্গ হিসেবেই বিবেচনা করা হয়। এবারও প্রার্থী হয়েছেন তিনি। কিন্তু বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নয়। হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এ কারণে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন।
সাক্কুর বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন আরও দুই হেভিওয়েট প্রার্থী। ফলে নগরজুড়ে ত্রিমুখী লড়াইয়ে চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। সাক্কু কী পারবেন গেল দুইবারের মতো সবাইকে টেক্কা দিয়ে হ্যাট্টিক জয় তুলে নিতে? নাকি মেয়রের আসনে বসবেন নতুন কেউ?
বুধবার (১৫ জুন) সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত চলবে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৫ জন প্রার্থী। তারা হলেন- আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত, বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা ও সদ্য বিদায়ী মেয়র মনিরুল হক সাক্কু (টেবিল ঘড়ি), বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত অপর নেতা নিজাম উদ্দিন কায়সার (ঘোড়া), ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের রাশেদুল ইসলাম (হাত পাখা) এবং কুমিল্লা নাগরিক ফোরামের সভাপতি কামরুল আহসান বাবুল (হরিণ)।
২৭ মে প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দের পর থেকেই ১৩ জুন পর্যন্ত বিরামহীনভাবে প্রচার চালিয়েছেন প্রধান তিন প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থী। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দিয়েছেন নানা প্রতিশ্রুতি। নির্বাচনে মেয়র পদে আরও দুই প্রার্থী থাকলেও তাদেরকে হিসাবে রাখছেন না কেউ। এ ছাড়া নির্বাচনী এই ঢামাঢোলের মাঝেও চোখে পড়েনি তাদের কোনো প্রচার; দেখা মিলেনি পোস্টারও। ফলে ভোটের হিসাব চলছে প্রধান তিন প্রার্থীকে ঘিরেই।
দুইবারের সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু এবং নিজাম উদ্দিন কায়সার একই রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কার হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় দুভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বিএনপির ভোট। আর এই সুবিধাটা বেশ ভালোভাবেই কাজে লাগাতে পারবেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত। গ্রুপিংয়ের রাজনীতিতে বরাবরই আলোচনায় থাকা কুমিল্লা আওয়ামী লীগে এবার উল্টো চিত্র। আগের দুবার যেখানে আওয়ামী লীগের বিভক্তির কারণে সাক্কু জয়ী হয়েছিলেন বলে মনে করা হয়; সেখানে এবার ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগের সামনে বিভক্ত বিএনপির দুই প্রার্থী। ফলে উল্টে যেতে পারে পাশার দানও।
সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, বিএনপি থেকে আজীবনের জন্য বহিষ্কৃত মনিরুল হক সাক্কু যেসব সমীকরণে মেয়র পদে বিজয়ী হতেন এবার সেসব সমীকরণ আর ধোপে টিকবে না মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ আওয়ামী লীগের যে অংশের সহযোগিতা তিনি গ্রহণ করেন বলে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতেন- সেই অংশেই এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত।
তাছাড়া যে বিএনপির সমর্থনের কথা তিনি বলেন, সেই বিএনপির মূল অংশ থেকেই এবার প্রার্থী হয়েছেন নিজাম উদ্দিন কায়সার। একইসঙ্গে সাক্কুর জন্য বড় বিপর্যয় হচ্ছে, তার সাথে থেকে যেসব বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা কাজ করে বিজয় নিশ্চিত করতেন তাদের বেশিরভাগই অনেক আগে থেকে সাক্কুর সঙ্গে নেই। সাক্কুকে ঠেকাতেই তাদের তৎপরতা বরং বেশি। ফলে সাক্কুকে এবার কঠিন পরীক্ষা দিতে হবে নির্বাচনে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনিরুল হক সাক্কু বলেন, কুমিল্লার মানুষ দলমত নির্বিশেষে আমাকে ভালোবাসে। এর আগে দুবার তারাই আমাকে মেয়র নির্বাচিত করেছেন। প্রথমবারের নির্বাচনে যখন বিএনপি অংশ নেয়নি সেবারও জনগণ আমাকে মেয়র বানিয়েছে। পরেরবার বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে যখন ভোটারদের কাছে গিয়েছি; তারা আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি। জনগণের প্রতি আমার আস্থা আছে; জনগণেরও আমার ওপর আস্থা আছে। জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী তিনি।
অপরদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আরফানুল হক রিফাত বলেন, কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে গত ১০ বছরে কোনো দৃশ্যমান উন্নয়ন হয়নি। আগের মেয়র (সাক্কু) টানা ১৬ বছর কুমিল্লা পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের দায়িত্বে ছিলেন। দীর্ঘ সময়ে কুমিল্লার মানুষের জন্য তিনি কী করেছেন, তা দৃশ্যমান। আধা ঘণ্টা বৃষ্টি হলেই শহর পানির নিচে চলে যায়। যানজট ও স্বাস্থ্য সমস্যাসহ আরও নানান সমস্যা রয়েছে। এর ফলে কুমিল্লার মানুষ এবার পরিবর্তন চায়, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন চায়। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ এবং কুমিল্লার সর্বস্তরের মানুষ তাদের উন্নয়নের সার্থেই এবার আমাকে মেয়র নির্বাচিত করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
মেয়র নির্বাচিত হলে ‘মেধা এবং শিক্ষা’ দিয়ে কুমিল্লা সিটি করপোরেশন পরিচালনা করবেন বলেও জানান তিনি।
বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত অপর স্বতন্ত্র প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সার বলেন, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকা কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। সেই পরিবর্তনের জন্যই কুমিল্লার মানুষ আমাকে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে বেছে নিবেন।















