স্টাফ রিপোর্টার :
সরকারের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি অধিক ঋণনির্ভর ও উচ্চাভিলাষী বলে মন্তব্য করেছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, এ বাজেট অবাস্তবায়নযোগ্য এবং লুটপাটের বাজেট। শুক্রবার মগবাজারের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে বাজেটের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন, দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মু. আতাউর রহমান সরকার ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আব্দুস সাত্তার সুমন। এর সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটটি ব্যাংক ও বৈদেশিক বিরাট ঋণের উপর নির্ভরশীল উল্লেখ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আর্থিক সংস্থান করতে গিয়ে ৬ লাখ ২৯ হাজার কোটি টাকার যে রাজস্ব আয়ের কথা বলা হয়েছে, সেই রাজস্ব কিভাবে আদায় করা হবে তা স্পষ্ট করা হয়নি। বাজেটের ঘাটতি ২ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ কোটি টাকা কোথা থেকে পূরণ করা হবে- সেটি স্পষ্ট নয়। যেসব উৎস দেখানো হচ্ছে সেখানে যে কর কাঠামো, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন প্রয়োজন- সেগুলোর উল্লেখ নেই।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, এবারের বড় ঘাটতি বাজেটের যে ব্যয় সংকুলান, তা ব্যাংক লোন থেকে করা হবে। তাতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে। ব্যাংক থেকে সরকার ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ করতে পারবে না, স্বাভাবাকিভাবে বেসরকারি খাতে প্রভাব পড়বে।
বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় বাধা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, প্রথমত, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ক্রমবর্ধমান ব্যয়। গত কয়েক মাসে গ্যাস, জ্বালানি এবং বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বৃদ্ধি করা হয়েছে। জ্বালানি হলো উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান চালিকাশক্তি। এর মূল্য বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে এবং অর্থনীতির সব খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দ্বিতীয়ত; লাগামহীন মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে ক্রমাগত বাড়ছে। তৃতীয়ত; বৈশ্বিক ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কারণে বাজেট বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে।
জামায়াতের ছায়া বাজেটের সঙ্গে সরকারের বাজেটের তুলনামূলক আলোচনা তুলে ধরে সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার বলেন, গতকাল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য যে বাজেট পেশ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে ৫৫তম জাতীয় বাজেট। জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের জনগণ একটি জনবান্ধব, সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী এবং বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু সরকারের ঘোষিত বাজেটে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং জীবনমান উন্নয়নের সুস্পষ্ট বার্তা প্রতিফলিত হয়নি। মিয়া গোলাম পওয়ার বলেন, কর প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে কার্যকর সংস্কারের প্রতিফলন বাজেটে দেখা যায়নি। আমরা আশঙ্কা করছি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এই বিপুল অঙ্কের বাজেট বাস্তবায়নের সময় দুর্নীতি, অপচয় এবং লুটপাটের ঝুঁকি বাড়বে।
জামায়াতের ছায়া বাজেটে আমরা অর্থবছরের সময়সীমা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দিয়েছি জানিয়ে সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থবছর জুনে শেষ হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে তড়িঘড়ি করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রবণতা দেখা যায়। এতে কাজের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং দুর্নীতির সুযোগ সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার এবং বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থের অপচয় ও অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া যায়। তাই আমরা একটি অধিক কার্যকর, জবাবদিহিমূলক এবং ফলপ্রসূ উন্নয়ন ব্যয় কাঠামোর পক্ষে মত দিয়েছি।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বাজেটে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং শিল্প খাতের বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর ব্যয় ও কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর ফলে শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পেট্রোলিয়াম, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধি জনজীবনে দুর্ভোগ বয়ে আনবে। আরএমজি তথা তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের রপ্তানি খাতকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা কাঠামো পরিবর্তনের যে প্রক্রিয়া চালানো হয়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমীরে জামায়াত সংসদে তাঁর বক্তব্যে দাবি করেছেন, যাদের শেয়ার অন্যায়ভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে, তাদের শেয়ার যে মূল্যে নেওয়া হয়েছে, সেই মূল্যে ফেরত দেওয়া হোক। একইভাবে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালককে পরিবর্তন করে রাজনৈতিক পছন্দ অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতারও আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।
















