ঢাকাকে বাসযোগ্য পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন

বাংলাদেশের নগরায়ণকে কেবল বহুতল ভবন, প্রশস্ত সড়ক, ফ্লাইওভার ও আবাসন প্রকল্পের সম্প্রসারণ হিসেবে বিবেচনা না করে মানুষের জীবনমান, সামাজিক সংযোগ, পরিবেশগত ভারসাম্য ও সাম্যের ভিত্তিতে নতুন উন্নয়ন দর্শন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। বিশ্ব শহর দিবস উপলক্ষে শুক্রবার অনলাইনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। আইপিডির অনুষ্ঠানের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বাংলাদেশের নগরায়নের উন্নয়ন দর্শন’।
আমাদের শহরগুলোকে সিংগাপুর, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক কিংবা টোকিও, লন্ডন, নিউইয়র্ক বানানোর প্রচেষ্টা বন্ধ করা দরকার উল্লেখ করে এসময় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের নগরায়ণে বিদেশি নগর মডেলের অন্ধ অনুকরণ না করে দেশের নিজস্ব ভূপ্রকৃতি, জলাভূমি, পুকুর, উঠান, পাড়া-মহল্লার সামাজিক সম্পর্ক, স্থানীয় সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার ইতিবাচক বৈশিষ্ট্যগুলোকে আধুনিক পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। উন্নয়নের প্রকৃত সাফল্য শুধু ভবনের উচ্চতা কিংবা অবকাঠামোর পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং একটি শহর কতটা বাসযোগ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক, পরিবেশবান্ধব ও সামাজিকভাবে সংযুক্ত—তা দিয়ে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

অনুষ্ঠানের মূল প্রবন্ধে আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাড়া-মহল্লা, পুকুর, উঠান ও খেলার মাঠ একসময় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। এগুলো শুধু বসবাসের স্থান বা প্রাকৃতিক সম্পদ ছিল না; বরং পারস্পরিক পরিচয়, সামাজিক যোগাযোগ, সহযোগিতা, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলা এবং কমিউনিটিভিত্তিক জীবন গড়ে ওঠার ক্ষেত্রও ছিল। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাশয় ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল এবং বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থার বিস্তারে এসব সামাজিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

অধ্যাপক আদিল বলেন, আমাদের নগরায়ণ দর্শন হতে হবে বাংলাদেশের মাটি, পানি, মানুষ ও সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। আমরা কেন এমন শহর গড়ে তুলতে পারব না, যেখানে আধুনিক অবকাঠামোর পাশাপাশি পুকুর থাকবে, শিশুদের খেলার মাঠ থাকবে, মানুষের মিলনস্থল থাকবে এবং প্রতিবেশীরা একে অপরকে চিনবে? উন্নয়ন মানে শুধু বহুতল ভবন নির্মাণ নয়; উন্নয়ন মানে মানুষের জন্য একটি সুস্থ ও মানবিক জীবন নিশ্চিত করা।

আইপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, পরিকল্পনাহীন ও অতিরিক্ত বিচ্ছিন্ন আবাসনব্যবস্থা নগরের সামাজিক সংযোগ দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করে। বিশেষ করে কিছু গেটেড কমিউনিটি ও আবাসিক কমপ্লেক্সে শ্রেণিভিত্তিক বিচ্ছিন্নতা, সীমিত জনপরিসর এবং বাইরের সমাজের সঙ্গে কম যোগাযোগের প্রবণতা দেখা যেতে পারে। অনুষ্ঠানে আইপিডির উপদেষ্টা অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, কেবল জিডিপির উন্নয়ন বা বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণকেই নগরায়ন বলা চলে না। প্রকৃত নগরায়ন হতে হবে মানুষের কল্যাণে, যেখানে নগরের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার, জনস্বাস্থ্য ও প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধার অধিকার নিশ্চিত হবে। নগর এলাকায় পাড়া, নেইবারহুড ব্লক ও শহরের জন্য বিভিন্ন স্তরের নাগরিক সুবিধার সুষম বিন্যাস নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন এর বিকেন্দ্রীকরণ করতে অর্থনৈতিক করিডোরভিত্তিক উন্নয়ন এর পরামর্শ দেন এই পরিকল্পনাবিদ। বিআইপির সভাপতি ড. মুহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, উন্নয়ন দর্শন নয়, বরং ব্যবসায়িক ও গোষ্ঠী স্বার্থই নগরের উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে প্রতিনিয়ত বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে আমাদের শহরগুলো। ময়মনসিংহের মত মাঝারি কিংবা সেকেন্ডারি শহরগুলোতেও এই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আবাসন এলাকা এখন কেবল ঘুমানোর জায়গা, অথচ নগর দর্শনে আবাসন এলাকাগুলো প্রাণবন্ত কমিউনিটিভিত্তিক এলাকা হবার কথা ছিল।

Facebook Comments Box