সরকার বদলের সাথে সাথে সারাদেশে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু পরিবর্তন আসে না মোহাম্মদপুরবাসীর নিত্য দূর্দশার জীবনে। সরকার বদলের সাথে এলাকায় আন্ডার গ্রাউন্ড জগতে ক্ষমতার হাত বদল শুরু হয়ে যায়। পালাবদলের ধাক্কায় এখন সন্ত্রাসীদের প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে চরম আতঙ্কে রয়েছেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা। কখনো জমি দখল, কখনো বাজার দখল কিংবা মাদককারবাদিদের দুই গ্রুপের দ্বন্দ্বে গুলিবিদ্ধ হয়ে একের পর এক নিহত ও আহতের ঘটনা ঘটছে। তবে এসব ঘটনায় মূল অপরাধীরা সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় সন্ত্রাসী কর্মকান্ড যেন থামছেই না।
এরমধ্যে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ কাঁচাবাজার মার্কেটের অফিসের ভেতরে মার্কেট সভাপতি আবুল হোসেন (৫০) ও তার ছোট ভাই মাহবুব মিয়াকে (৪২) গুলি করার ঘটনায় এখনো কেউ শনাক্ত হয়নি। তবে অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে তৎপর রয়েছে পুলিশ। ভুক্তভোগী গুলিবিদ্ধ দুজন হাসপাতালে থাকলেও সন্ত্রাসীদের ভয়ে এখনো কোন অভিযোগ কিংবা মামলা করেনি। এদিকে, গত বুধবার মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে দুই মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় শাহনেওয়াজ ওরফে কাল্লু (৩৭) নামে এক যুবক গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় মূল হোতাদের গ্রেপ্তার না করায় দিনদিন বেপোরোয়া হয়ে উঠছে মাদককারবারিরা। এদের কারণে আশপাশের বাসিন্দারা চরম আতঙ্কে রয়েছেন। দ্রুত দোষীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। মূলত দোষীদের আইনের আওতায় না আনায় গোলাগুলিতে প্রায় নিহতের ঘটনা ঘটছে।
এরআগে গত ৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে জেনেভা ক্যাম্প কলেজ গেট এলাকায় মাদক ব্যবসায়ীদের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মো. সনু (৩০) নামে এক রিকশাচালক নিহত হয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হয়নি। ফলে গত বুধবার ফের দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে একজন নিহত হয়েছে। মূলত দুটি মাদক কারবারী গ্রুপের মধ্যে তীব্র বিরোধ থাকায় প্রায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। একটি গ্রুপের সাথে রয়েছে শাওন, মো. মনির, আলমগীর ও তার ভাই পারভেজ, রাসেল, রুবেল, লিটন, বাচ্চু, শরীফ, খোকনসহ অনেকে। এরা জেনেভা ক্যাম্পের বি-ব্লকের ১০৮ নং বাড়িতে বসবাস করছে। এ ছাড়া, আরেক গ্রুপের সাথে মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে রয়েছে, নাটু-সুমন, সাকিনা, কসাই-বাবু, দিলদার পি বিহারি মাদক ব্যবসায়ীরা পিচ্চি রাজা আলতাফ শনারু-এরশাদ কামরান পাগলা-আজাদ চুওয়া-সেলীম ফকলা-নাসীমওয়াহাব লিটন কান-কামরান সুরাজ বেচু মাছুওয়া-সাঈদ উল্লেখযোগ্য। এই দুই গ্রুপের মধ্যে মাদক বেচাকেনা নিয়ে প্রায় সংঘর্ষে নিহতের ঘটনা ঘটছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মোহাম্মদপুরস্থ জেনেভা ক্যাম্পে প্রায় এক লাখ আটকে পড়া পাকিস্তানি বসবাস করছে। ক্যাম্পের ঘিঞ্জি পরিবেশে গড়ে উঠেছে বিশাল মাদক সিন্ডিকেট। এটি পুরো রাজধানীর মাদকের আস্তানাও বলছেন অনেকে। এখানে পাঁচ শতাধিক মাদকের স্পট রয়েছে। আর এ নিয়ন্ত্রণ আলমগীর ও তার ভাই পারভেজ, রুবেলসহ একাধিক চক্র। এদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ আশপাশের বাসিন্দারা। গত আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় এদের বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় একাধিক মামলা ও অভিযোগ থাকার পরেও এই চক্রের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। ফলে ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকছে মাদক ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গত বুধবার দুই গ্রুপের গোলাগুলিতে একজন নিহতের ঘটনায় সরাসরি জড়িত আলমগীর ও তার ভাই পারভেজ। অথচ আইনশৃঙ্খলাবাহীনির সদস্যরা তাদের গ্রেপ্তার করছে না। সম্প্রতি মাদক বেচাকেনার সময় আইনশৃঙ্খলাবাহীনির হাতে গ্রেপ্তার হয় পারভেজ। দুই মাস পর জেল থেকে বের হয়ে ফের মাদক ব্যবসার সাথে জড়িয়েছে পারভেজ। তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করছে তার ভাই আলমগীর।
বুধবার দুই গ্রুপের প্রকাশ্যে গোলাগুলিতে অংশ নেয় পারভেজ। এখন সে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়ালেও আইনশৃঙ্খলাবাহীনি তাকে আটক করছে না বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা নিলয় খান বলেন, আলমগীর ও তার ভাই পারভেজ সরাসরি মাদক ব্যবসায় জড়িত। বিশেষ করে পারভেজের নামে অগনিত মামলা রয়েছে। সম্প্রতি সে জেল থেকে বের হয়ে একই কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। গত বুধবারের গোলাগুলিতে নিহতের ঘটনায়ও পারভেজসহ অনেকেই সরাসরি জড়িত। অথচ তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের আইনের আওতায় না আনলে ফের একই ঘটনা ঘটবে। জানতে চাইলে মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলী ইফতেখার হাসান বলেন, মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে সক্রিয় অপরাধীরা। তারা আদিপত্য বিস্তারে প্রায়ই গোলাগুলিতে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের ওপর নজরদারি রাখতে এবং তাদের গ্রেপ্তার করতে ক্যাম্পের বাইরে চেকপোস্ট বসানো আছে। নিয়মিত অভিযানও চালানো হচ্ছে। সম্প্রতি ক্যাম্পে সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার রাতে শিয়া মসজিদ এলাকায় গোলাগুলির ঘটনায় এখনো কেউ অভিযোগ করেনি। আমরা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ পাইনি। তবে কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।
















