ভোলা-৪ (চরফ্যাশন ও মনপুরা)
প্রার্থী বাছাইয়ে দুই দলের জটিল সমীকরণ

নাদিম হোসেন খাঁন, চরফ্যাশন ভোলা 

দ্বীপ জেলা ভোলার সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত ভোলা-৪ সংসদীয় আসনটি চরফ্যাশন ও মনপুরা দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত। সংসদ নির্বাচনে এ আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। তবে অন্য দলের প্রার্থীও রয়েছে। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় দুই দলেই রয়েছে একাধিক প্রার্থী। জাতীয় পার্টি আরও একধাপ এগিয়ে। এরশাদ অনুসারীদের প্রার্থী সংখ্যা চার। একক প্রার্থী আছে ইসলামী আন্দোলনে। জোটবদ্ধ নির্বাচনের কারণে ২০০১ সাল থেকে এ আসনে প্রার্থী দিচ্ছে না জামায়াত। তবে এবার দলটি একক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে সারা দেশে প্রার্থী ঘোষণা দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত একক নির্বাচনে গেলে জামায়াতেরও প্রার্থী থাকবে ভোলা-৪ আসনে। এই জনপদে ভোটের সমীকরণে নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীকের বিশেষ প্রভাব থাকলেও নির্বাচনে জিততে প্রার্থী বাছাইয়ে কৌশলী হতে হবে দলগুলোকে। কারণ পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চরফ্যাশন মনপুরায় ভোটের সমীকরণ ক্রমেই জটিল হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে বেশিরভাগ সময় এই আসনে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ছিলেন। তবে ১৯৯৬ সালে ধানের শীষের প্রার্থী বিজয়ী হওয়ার পর এ আসনটিতে নির্বাচনি সমীকরণ পাল্টে যায়। টানা ১০ বছর বিএনপির দখলে থাকে আসনটি। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে ধরপাকড় শুরু হলে বিএনপির সিনিয়র নেতারা গা-ঢাকা দেন। কর্মীদের মধ্যেও আতঙ্ক ও অস্থিরতা শুরু হয়। অভিভাবকহীন ছন্নছাড়া বিএনপির মাঠের দুর্বলতার সুযোগ ভালোভাবেই কাজে লাগায় আওয়ামী লীগের একসময়ের জনপ্রিয় নেতা ও তিনবারের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের ছেলে আব্দুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব। তার হাত ধরেই চরফ্যাশনের আওয়ামী রাজনীতি ফের ঘুরে দাঁড়ায় এবং তিনি সংসদ সদস্য হন।

এরপর আর পিছে তাকাতে হয়নি, চরফ্যাশন-মনপুরায় দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে আওয়ামী রাজনীতি। ১৫ বছর একটানা ক্ষমতায় থেকে শক্ত ভিত গড়ে তুলেছেন নৌকা প্রতীকের অনুসারিরা। বিপরীতে কোণঠাসা হয়ে কোনোমতে টিকে আছে বিএনপি। মূলদল ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটি গঠনে দীর্ঘসূত্রতায় নেতৃত্বের জট তৈরি ও ত্যাগী নেতাদের অবমূল্যয়নসহ নানা জটিলতায় বিএনপির রাজনীতি চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ধরে ছাত্রদলের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে যুব ও তরুণ প্রজন্মের বড় অংশ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগে নাম লিখিয়েছে।

স্থানীয় রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, আসন্ন নির্বাচনে যদি নিরপেক্ষ পরিবেশ তৈরি হয় তাহলে এ আসনে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। কারণ বর্তমান সরকারের টানা তিন মেয়াদে অভূতপূর্ণ উন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মন জয় করে নিয়েছে বর্তমান সংসদ সদস্য জ্যাকব। অন্যদিকে এ অঞ্চলের মানুষের মাঝে জিয়া পরিবারের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন সাবেক সাংসদ নাজিম উদ্দিন আলম। ১৯৯৬ সালে তার নাটকীয় উত্থানের মধ্য দিয়ে ধানের শীষ ব্রান্ড হয়ে উঠেছিল এ জনপদে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থেকে বিএনপির রাজনীতি ছন্নছাড়া অবস্থা থাকলেও ধানের শীষ ও খালেদা জিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশেষ আকর্ষণ ভোটের হিসাব পাল্টে দিতে পারে। তবে জামায়াত যদি প্রার্থী দেয় তাহলে জটিল সমীকরণ তৈরি হতে পারে। কারণ চরফ্যাশন-মনপুরায় বিগত সময়ে জামায়াতের অবস্থান খুব একটা ভালো না থাকলেও এবার চমক দেখাতে পারে দলটি। কারণ এ অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে জামায়াতের সাজাপ্রাপ্ত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর প্রতি বিশেষ আকর্ষণ রয়েছে। এতে জামায়াতের ভোট ভাগ হলে জয় সহজ হবে আওয়ামী লীগের।

আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতারা বলছেন, টানা তৃতীয়বারের মতো এমপি হয়ে জ্যাকব তার পিতা সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ নজরুলের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করে যাচ্ছেন। তিনি গত ১৪ বছরে চরফ্যাশনের আমূল পরিবর্তন করেছেন। তিনি চরফ্যাশন উপজেলায় ১৪টি ইউনিয়ন থেকে ২১টি ইউনিয়নে রূপান্তর করেছেন। জ্যাকবের প্রচেষ্টায় চরফ্যাশন উপজেলায় একটি থানা থেকে শুরু করে চারটি থানা স্থাপন করা হয়।

Facebook Comments Box