স্টাফ রিপোর্টার : জনগণের অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশে বিপ্লব বারবার ফিরে আসবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয়, এটি একটি ভাইরাস। সমাজের সর্বক্ষেত্রে এই ভাইরাসের লক্ষণ এখন স্পষ্ট। যারা জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হবেন, তাদের পরিণতি ৭ নভেম্বরের মতোই হবে। শুক্রবার রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জাতীয় বিপ্লবী ও সংহতি দিবস উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায় প্রধান অথিতির বক্তব্য তিনি এ কথা বলেন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন, দলের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লার সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমীর আব্দুর রহমান মূসা, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাত এবং প্রচার-মিডিয়া সম্পাদক আতাউর রহমান সরকার।
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহিরা কেন বিদ্রোহ করেছিলেন, তার পেছনে অনেক কারণ ছিল উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সরকার দেশের প্রায় সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। নির্বাচনের আগে কোরআন-সুন্নাহর ওপর কোনো আঘাত করা হবে না বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত অবস্থান নেওয়া হয়। জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার জনগণের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য বাহিনী থাকা সত্ত্বেও নিজেদের কর্মকান্ডের পরিণতি নিয়ে শঙ্কিত হয়ে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয়। রক্ষীবাহিনীকে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়; তাদের বিরুদ্ধে বিচার ও জবাবদিহির কোনো কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। তিনি অভিযোগ করে বলেন, এ বাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।
তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারকে বিনা বিচারে হত্যার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। দেশে হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও মানুষের সম্মানহানির বিচার ছিল না। একদিকে বিরোধী মত দমন করা হয়েছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। একজন কর্মরত সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীকে অপহরণের ঘটনায় বিচার চাইতে গিয়ে ওই কর্মকর্তাকে চাকরি হারাতে হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ব্যাংক লুট ও নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। হোটেল শেরাটনের একটি স্যুটকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভয়ে অভিভাবকেরা মেয়েদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জনগণের জন্য বিদেশ থেকে পাঠানো ত্রাণসামগ্রীও যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি অনেক ত্রাণ বাইরে বিক্রি হয়ে গেছে। এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সাত কোটি মানুষের জন্য আট কোটি কম্বল আসার হিসাব তুলে ধরে নিজের কম্বল না পাওয়ার কথা বলেছিলেন।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু এখন সেই রায় মানা হচ্ছে না। মূলত তারা আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ফিরে যাওয়ার সকল আয়োজন পূর্ণ করে ফেলেছে। অন্যদিকে অন্তর্বর্তী সরকার যে ১৩৩টা অধ্যাদেশ জারি করে গিয়েছিল- সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই রেওয়াজ অনুযায়ী তা উত্থাপন হওয়ার কথা, তা হয়েছেও। কিন্তু আলোচনায় সব আসেনি। বরং তা থেকে এমন ২০টা অধ্যাদেশ বাতিল করে দেওয়া হলো, যা থাকলে ফ্যাসিবাদ আবার নতুন করে ফিরে আসতে পারত না।
তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকজনকে বসিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পরিবর্তে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দেওয়ার মাধ্যমে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে চাকরি ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করেছিল। কিন্তু এখন সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আরও সদস্যকে চাপের মুখে বিদায় করার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের দাবিকে সম্মান না করে তাঁদের সঙ্গে উপহাস করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, দীর্ঘদিন তাদের কর্মীরা নির্যাতিত ও বঞ্চিত ছিলেন, এখন তাঁদের মূল্যায়ন করা হবে। দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার এমন মনোভাব জাতির যুবসমাজের প্রতি অবিচার।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণের প্রয়োজনেই বারবার বিপ্লব ফিরে এসেছে। আমরা সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ করতে চেয়েছি। প্রথম দিন থেকেই সংসদ অকার্যকর করে দেওয়ার কোনো ঘোষণা দিইনি। ন্যায়সংগত বিষয়ে সহযোগিতা করব, অন্যায় হলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করব- এটাই বিরোধী দলের নীতি। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে একের পর এক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। র্যাব বিলুপ্তির দাবি শুধু দেশের জনগণ নয়, আন্তর্জাতিক মহল থেকেও উঠেছিল। নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীনরা এ বাহিনী বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে নতুন কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, আগের বাহিনীর লোকবল ও কাঠামো বহাল রেখে শুধু নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন হলে সময় নিয়ে আলোচনা করে নতুন বাহিনী গঠন করা যেতে পারে; বর্তমান সদস্যদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে দিয়ে দেশপ্রেমিক ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কাঠামো গঠন করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই সংস্কারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে সংবিধান সংশোধনের নামে ভিন্ন পথে যাওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের সঙ্গে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। জনগণ শিশু নয়; তারা অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভোট দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছে। অতএব জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিরোধী দলের দায়িত্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেগুলোর প্রতিবাদ না করলে বিরোধী দল হিসেবে জনগণের প্রতি অর্পিত দায়িত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। এ কারণেই তারা সাত দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এসব দাবি কোনো দলের একক দাবি নয়; এগুলো জনগণের দাবি। সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির পথ খোলা নেই। ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয়, এটি একটি মানসিকতা ও ভাইরাসের মতো; যে কেউ ক্ষমতায় গিয়ে এই মানসিকতায় আক্রান্ত হতে পারে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ দেখা গেলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।
তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের শিক্ষা হচ্ছে- দেশ পরিচালনায় জনগণের মনের ভাষা বুঝতে হবে। যারা জনগণের আকাক্সক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হবে, তাদের পরিণতি ইতিহাসে বারবার ফিরে আসবে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। একদিকে কেউ বলছেন, ওই আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না, এটি ছিল কেবল ছাত্রদের আন্দোলন; অন্যদিকে আবার দাবি করা হচ্ছে, আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড তাদের নেতা। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে জাতির সঙ্গে উপহাস করা হচ্ছে। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ওই আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করেনি; বরং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে দেশের জনগণের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিয়ামত হিসেবে বিবেচনা করে। ওই আন্দোলনে শহীদদের পরিবার এবং আহত ও পঙ্গুদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ ক্ষেত্রে কোনো দলীয় পরিচয় দেখা হয়নি; যারা প্রতিবাদের যোদ্ধা, তাদের পাশে দাঁড়ানো দায়িত্ব বলে মনে করা হয়েছে।
সরকারকে ভুল পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বললে মাতারবাড়ীসহ জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি জাতির সামনে পরিষ্কার করতে হবে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না। বাংলাদেশের জনগণ ও যুবসমাজ আধিপত্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করবে। আধিপত্যবাদের কালো ছায়ামুক্ত স্বাধীন জাতি গঠন, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূলের জন্য তাঁরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মানবতার মুক্তি এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত থাকবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে শুধু একটি সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; এর পেছনে ছিল একদলীয় শাসন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনমনের ক্ষোভ। তিনি বলেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানেও জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সভাপতির বক্তব্যে মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর জনগণ যে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল, তা পূরণ হয়নি। ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসন, দমন-পীড়ন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। কিন্তু চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, বাজার সিন্ডিকেট, দলীয়করণ ও জনদুর্ভোগ অব্যাহত থাকলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
















