যুদ্ধ বন্ধ করে সবার কাছে খাবার পৌঁছে দিন

যুদ্ধ এবং খাদ্য নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করতে এবং সবার কাছে খাবার পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশ্ব নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, বিশ্বের ৮০ কোটির বেশি মানুষ ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যায়, যা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আরও খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে।

সোমবার ‘বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন-২০২২’র উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের সময় দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতালির রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সদরদপ্তরে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি অংশ নেন।

শেখ হাসিনা বলেন, আমি যুদ্ধ বন্ধ করতে, খাদ্য নিয়ে রাজনীতি বন্ধ করতে এবং খাদ্যের অপচয় বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অনুরোধ করছি। পরিবর্তে, খাদ্য ঘাটতি এবং দুর্ভিক্ষকবলিত এলাকায় খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করুন। মানুষ হিসেবে, আমাদের অবশ্যই বিশ্বাস করতে হবে যে, প্রত্যেকেরই খাদ্য নিয়ে বেঁচে থাকার এবং একটি সুন্দর জীবন যাপনের অধিকার রয়েছে।

‘অন্যদিকে যদি অস্ত্র তৈরিতে বিনিয়োগ করা অর্থের একটি ভগ্নাংশ খাদ্য উৎপাদন এবং বিতরণে ব্যয় করা হয় তবে এই পৃথিবীতে কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না।

ভার্চুয়ালি ফোরামে যোগ দিতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, এ ফোরাম এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন বিশ্বব্যাপী খাদ্য ব্যবস্থা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞা, কোভিড-১৯ মহামারি এবং আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে খরার কারণে বিপর্যস্ত।

সরকারপ্রধান বলেন, আমি আশা করি এটি কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সমাধানগুলো অগ্রসর করতে মূল স্টেকহোল্ডারদের মধ্যে সংলাপকে উৎসাহিত করবে।

প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ৮০ কোটিরও বেশি মানুষ বা বিশ্বের জনসংখ্যার ১০ শতাংশ বরাবরই ক্ষুধার্ত অবস্থায় বিছানায় যায় এবং ইউক্রেন যুদ্ধ, পরবর্তী নিষেধাজ্ঞা, পাল্টা নিষেধাজ্ঞার ফলে পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ ব্যাহত করেছে এবং খাদ্যের দাম বাড়িয়েছে।

তিনি বলেন, বিশ্বে সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উল্লেখযোগ্য অবদানের ফলে তা আরও বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও এই বঞ্চনা আমাদের জন্য সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। আমি বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের এই কৃষি খাতে বিনিয়োগের জন্য আমন্ত্রণ জানাতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে এফএও-তে যোগদানে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, জাতিসংঘের এই আন্তর্জাতিক সংস্থা নতুন দেশটির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর অগ্রণী উদ্যোগের মধ্যে ছিল কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণির অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য সবুজ বিপ্লবের ডাক দেওয়া। বঙ্গবন্ধু কৃষি উন্নয়নের জন্য দেশের উন্নয়ন বাজেটের পঞ্চমাংশ বরাদ্দ করেন এবং কৃষির সার্বিক উন্নয়নে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন এবং বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকসহ অনেক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, দুঃখজনকভাবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করা হয়। তার মৃত্যুতে কৃষি কর্মসূচি এবং অন্যান্য সব উন্নয়ন উদ্যোগ স্থবির হয়ে পড়ে। তারপরে কয়েক দশক অগ্রগতি ছাড়াই অতিবাহিত হয়। গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের জন্য ২১ বছর সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালের জুন মাসে তিনি একটি গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠনের জন্য নির্বাচিত হন।

তিনি বলেন, আমার বাবা দেশকে যেখানে রেখে গিয়েছিলেন, আমি সেখান থেকে শুরু করেছিলাম। বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে তার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা পুনরুজ্জীবিত করেছিলাম এবং বিশেষ করে কৃষিকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের বিষয়টি অন্যান্য সব প্রয়োজনের আগে প্রথম স্থান পেয়েছিল।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন ৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন চালের ঘাটতি ছিল এবং তার প্রথম মেয়াদ শেষে ২.৬ মিলিয়ন মেট্রিক টন চালের উদ্বৃত্ত ছিল।

তিনি বলেন, বর্তমান মেয়াদে তারা আবার ধান উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন। মোট চাল উৎপাদন ২০০৮ সালে ছিল ২৮.৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন, তা থেকে গত বছর উৎপাদন ৩৮ মিলিয়ন মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। আমাদের বাস্তববাদী নীতি, শক্তিশালী প্রণোদনা এবং বিশেষ করে আমাদের কঠোর পরিশ্রমী কৃষকদের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে।

তার সরকারের নীতিতে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য যান্ত্রিকীকরণ এবং নতুন প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কৃষকদের কৃষি যন্ত্রপাতিতে ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হারে ভর্তুকি প্রদান করা হচ্ছে। যোগ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, ২০১০ থেকে ২০২১ পর্যন্ত তাদেরকে ৭১ হাজারেরও বেশি কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে। তাছাড়া, ২০০৯ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত তার দ্বিতীয় মেয়াদে পৃথক ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ ২০ মিলিয়ন কৃষককে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড দেওয়া হয়েছিল।

তিনি বলেন, এই কার্ডধারীদের ফসল উৎপাদনের জন্য সরাসরি তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ঋণ দেওয়া হয় এবং কৃষি উপকরণের জন্য ভর্তুকি দেওয়া হয়।

‌‘এছাড়াও আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কৃষিতে বিনিয়োগের জন্য একটি কৃষি ও গ্রামীণ ঋণ নীতি গ্রহণ করেছে। ২০২০-২০২১ সময়কালে ২ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষককে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ প্রদান করা হয়েছে।

Facebook Comments Box