একজন সাধক সংগীত ব্যক্তিত্ব জি এম জাকির হোসেন

বিনোদন রিপোর্টঃ

একজন সাধক সংগীত ব্যক্তিত্ব গীতিকবি জিএম জাকির হোসেন,যিনি একাধারে একজন গীতিকবি,সুরকার ও একজন সঙ্গীত পরিচালক । বিভিন্ন শিল্পীর কন্ঠে যার লেখা ও সুরের গান ইতিমধ্যে বেশ সুনাম অর্জন করেছে। জি এম জাকির হোসেন ৩১ডিসেম্বর ১৯৭৮ সালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার চুপড়িয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম মোঃ নিয়ামুদ্দীন গাজী ছিলেন পেশায় একজন অতি সাধারণ কৃষক, মাতা রুপিয়া বেগম ছিলেন গৃহিণী।

শিশুকাল থেকেই সুরের প্রতি ছিল তার প্রবল আকর্ষণ। কোথাও কোন সুরের আওয়াজ পেলে কান পেতে দিতেন তিনি। এছাড়া গ্রামের মক্তবে আরবী পড়াকালে হামদ-নাত এবং কেরাত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার সুর চর্চা।

বাড়িতে তার মেঝ চাচার একটি রেডিও ছিল। সারাক্ষণ ঐ রেডিওটাই ছিল তাঁর ভীষণ আগ্রহের বস্তু। ভোর বেলা ঘুম ভাঙতো বাবা ও বড় ভায়ের মধুর কন্ঠে পবিত্র কোরান তেলোয়াত শুনতে শুনতে। সেই শিশু বয়সেই ধর্মীয় পরিবেশে হৃদয় বীণার তারে যে সুর বেঁজেছিল আজো তা অব্যাহত রয়েছে।

১৯৯৪ সালে সোনার বাংলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি ‘সাতক্ষীরা জেলা সাংস্কৃতিক পরিষদ’ এর সংগীত শিক্ষক মরহুম আমজাদ হোসেন এর নিকট সংগীত শিক্ষা শুরু করেন। একই সময়ে তিনি ওস্তাদ অপূর্ব রায়ের নিকট সংগীত এবং বিশ্বজিৎ সাহার কাছে তাল বিষয়ে তালিম নিতে থাকেন।

১৯৯৬ সালে সাতক্ষীরা সরকারী কলেজ থেকে এইচ এস সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর সরকারী সংগীত কলেজ, ঢাকাতে স্নাতক শ্রেণীতে সমন্বিত শাস্ত্রীয় সংগীত ও নজরুল সংগীত বিষয়ে ভর্তি হন। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগে স্নাতক (সম্মান) চালু হলে তিনি ১৯৯৭-৯৮ সেশনে সংগীত বিষয়ে ভর্তি হন।

সংগীত শিক্ষা জীবনে তিনি বহু জ্ঞানী-গুণী সঙ্গীত ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য লাভ করেছেন । সরাসরি গান শিখেছেন বিশিষ্ট নজরুল সংগীত শিল্পী খালিদ হোসেন, নিলুফার ইয়াসমিন, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, ওস্তাদ আখতার সাদমানী, সৈয়দ জাকির হোসেন, ড. মৃদুল কান্তি চক্রবর্তী, দীপক পাল, কুহেলী ইসলাম, শাহনাজ নাসরিন ইলা ও তপন সরকার সহ বহু সংগীত ব্যক্তিত্বের কাছে।

শিক্ষা জীবনে তিনি বহুবিধ সংগীত প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ধারাবহিকভাবে তিনবার তিনটি করে বিষয়ে মোট ছয়টি বিষয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে হ্যাটট্টিক চ্যাম্পিয়ান হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

দেশের শীর্ষস্থানীয় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশগ্রহণে ২০০০ সালে আয়োজিত সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় স্বরচিত দেশাত্মবোধক সংগীত প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জন করেন তিনি।

স্কুল জীবনে তিনি রোভার স্কাউটের দলনেতা ছিলেন। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নৌ শাখার ক্যাডেট সার্জেন্ট হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় ক্যাডেট কোরের সদস্যদের নিয়ে সাংস্কৃতিক চর্চাকে গতিশীল ও বেগবান করে তিনি একটি বিশেষ জায়গায় নিয়ে আসেন।

২০০০ সাল থেকে পরবর্তী তিন বছর বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর এর বার্ষিক প্রশিক্ষণ শিবির এ সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় একাধিক প্রথম পুরষ্কার অর্জন করে ঢাকা ফ্লোটিলাকে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পিছনে বিশেষ অবদান রাখেন। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের নৌ শাখা তার কৃতিত্ব ও সাফল্যের জন্য তাকে ‘বেস্ট অফ কালচার’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

২০০২ সালে একাডেমিক শিক্ষা জীবন শেষ করে পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সংগীত ও নৃত্য বিভাগে প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন।

তিনি বাংলাদেশ বেতারের গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক, লোকসঙ্গীত শিল্পী এবং আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে তালিকাভূক্ত। এছাড়া বাংলাদেশ টেলিভিশনে গীতিকার, লোকসঙ্গীত শিল্পী ও আধুনিক গানের শিল্পী হিসেবে তালিকাভূক্ত।

এ পর্যন্ত তরুণ প্রজন্ম সহ বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পীগন যারা তাঁর রচিত গানে কণ্ঠ দিয়েছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন শাহনাজ রহমান স্বীকৃতি, আরিফ দেওয়ান, শহীদ কবির পলাশ, আরিফুজ্জামান, বাঁধন, শ্যামা সরকার, ইয়াসমিন লাবণ্য, আরিফ চৌধুরী, কামরুল হাসান লিংকন, নাজিয়া বৃষ্টি, তাসমিম জামান স্বর্ণা, আলী হুসাইন, উপমা আক্তার বৃষ্টি, সূবর্ণা, মনিকা দেবনাথ কথা, অরুণ চৌধুরী, অর্চনা মালাকার ,অগ্নিতা শিকদার মুগ্ধ, মোহছেন আরা রিক্তা, আশরাফ শাহিন, মিথিলা, এসএম বিপাশ আনোয়ার, শবনম মুস্তারী প্রিয়াংকা ও আশরাফুজ্জামান মুকুলসহ অসংখ্য শিল্পী।

জি. এম. জাকির হোসেন শুধু নিজের গানেই সুরারোপ করেননি। মরমী গীতিকবি সাবির আহমেদ চৌধুরীর ১০টি দেশাত্মবোধক গানে তিনি সুরারোপ করেন। কলকাতা থেকে এই ১০টি গানের একটি অডিও এ্যলবাম প্রকাশিত হয়।

পরবর্তীতে গীতিকবি খোকন কুমার রায়, ফরিদা ফারহানা, এ টি এম আশরাফ হোসেন শাহিন, আলী আশরাফ আকন্দ, ইউনুস আলী মোল্লা, শিকদার ইসহাক আলী, মাহবুবুল ইসলাম ও গৌর পদ বসুসহ বহু গীতিকবির গানে সুরারোপ করেছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত গীতিকবি আমেনা ফাহিমের লেখা ‘তোমার রূপকথার গল্প শুনে’ শিরোনামের গানটি তিনি সুরারোপ করেছেন। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন ক্ষুদে গানরাজ খ্যাত শিল্পী তাসমিম জামান স্বর্ণা।

তার উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে- দুঁচোখে অঝোর বরষা শ্রাবণের মতো ঝরে যায়,ওরে নদী কত আর কাঁদবি বুকে ধরে অথৈ জল,কষ্টের কোন দৈর্ঘ্য নেই, মনের আগুন নিভাই কেমন করে,এতদিন বল তুমি কোথায় ছিলে,পোড়া মনে নেই আর দহনের কোন ভয়,আমার বুকেরি মাঝে তুই সুখের চাবি,জন্মেই দেখেছি বাংলাদেশ,যেখানে শত পাখি করে ডাকাডাকি,আমার মায়ের মধুর হাসি দেখি সবুজ ঘেরা বাংলাতে,কত স্বপ্ন আমার দুঁচোখে এবং আয় সোনামনিরে ডাকত মা আমারে – উল্লেখযোগ্য। তিনি বিয়াম ফাউন্ডেশন স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের সম্মানীত সদস্য এবং জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় ও বুলবুল ললিতকলা একাডেমিসহ বহু প্রতিষ্ঠানের সম্মানীত পরীক্ষক হিসেবে তিনি কাজ করেছেন।

প্রায় ২০টি জেলা শিল্পকলা একাডেমির শিক্ষক নিয়োগ বোর্ডের সরকারি প্রতিনিধি সদস্য হিসেবে তিনি অংশগ্রহন করেছেন। টিম কো-অর্ডিনেটর হিসেবে সরকারিভাবে জাপান ও লেবানন সফর করেছেন।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির পরিকল্পনায় ২০১৩ সালে জি.এম.জাকির হোসেনের তত্ত্বাবধানে দেশের ৬৪ জেলার ২০০জন প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীর কণ্ঠে ২০টি অডিও এ্যালবাম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ২০১৫ সালে ২০০জন শিশুশিল্পীর ২০টি অডিও এ্যালবাম প্রকাশিতি হয়।

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ ‍পূর্তিতে ‘শতবর্ষের আলোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের থিম সং করেন জনপ্রিয় এই মানুষটি।
গানটির প্রথম অংশ হলো-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এখানে স্বপ্ন নিয়ে স্বপ্ন বুনতে আসে,এখানেই জীবনের নতুন সূর্য হাসে,এখানে নতুন করে নতুন জীবন কথা কয়।

গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন দেশের বিশিষ্ট শিল্পীবৃন্দ। যাদের মধ্যে ছিলেন সৈয়দ আব্দুল হাদী, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, শুভ্রদেব ও ফাহিম হোসেন চৌধুরীসহ আরো অনেকে। জানতে চাইলে প্রিয় এই মানুষটি বলেন,গানই আমার নেশা, ছোটবেলা থেকে গানের প্রতি ছিল আমার ঝোঁক। গানই যেন আমার বেঁচে থাকার পরম তৃপ্তি। আমৃত্যু সঙ্গীতের সাথে থাকতে চাই।

উল্লেখ্য জি এম জাকির, পেশায় সরকারী কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রোগ্রাম অফিসার সংগীত নৃত্য ও আবৃত্তি এবং পরবর্তীতে উপসচিব এবং সচিবের দায়িত্ব পালন করছেন।

পরবর্তীতে উপপরিচালক গবেষণা ও প্রকাশনা, উপপরিচালক চারুকলার দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর সংগীত পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। সংগীত যার নেশা হাজার ব্যস্ততার মাঝেও তিনি সংগীত ছেড়ে থাকতে পারেননা। ছুটির দিনে কিংবা অবসর সময়ে তিনি নতুন নতুন গান রচনা, সুরারোপ এবং সংগীত পরিচালনায় ডুবে থাকেন।

Facebook Comments Box