নগরে-নগরে জলাবদ্ধতা শীর্ষক সংলাপে বক্তারা
প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করায় জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে না

নগর এলাকার প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে কৃত্রিম ড্রেনেজ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল হওয়ার কারণে মহানগর, জেলা ও পৌর এলাকার নগরসমূহে জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে না। বরং তা আরো বাড়ছে। কৃত্রিম ড্রেনেজ ব্যবস্থা ব্যয়বহুল হওয়া সত্বেও এ ধরনের প্রকল্পে আর্থিক সংশ্লেষ ও অর্থনৈতিক লাভের সুযোগ থাকাতে এ ধরনের ব্যয়বহুল প্রকল্পের প্রতি বিভিন্ন নগর সংস্থার অতি আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রাকৃতিক জলাধারগুলো নগরায়নের চাপে এবং নগর সংস্থাসমূহের উদাসীনতায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে শহরের বৃষ্টির পানি ধারণ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশের নগর এলাকায় জলাবদ্ধতা দূরীকরণের জন্য ড্রেনেজ পরিকল্পনার অবকাঠামোগত ও প্রকৌশলগত সমাধানের পাশাপাশি পরিকল্পনাগত ও ব্যবস্থাপনাগত সমাধানের কার্যকর ও টেকসই সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। শনিবার অনলাইনে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) আয়োজিত আইপিডি বাংলাদেশ সংলাপ এ, যার মূল প্রতিপাদ্য ছিল, নগরে-নগরে জলাবদ্ধতা: সা¤প্রতিক চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, সুনামগঞ্জ, বান্দরবান, কক্সবাজারসহ বিভিন্ন শহরের জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় আইপিডি’র নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, চট্টগ্রাম-সিলেট-বান্দরবান এর মত পাহাড়ি নগর এলাকার প্রাকৃতিক খাল-ছড়া প্রভৃতির নির্বিচার ধ্বংস এবং প্রাকৃতিক ভ‚মিরূপকে আমলে না নিয়ে নগর উন্নয়ন ও ভৌত কর্মকাÐ করবার ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় ভুগতে হচ্ছে নগরবাসীকে। জলাধার ও খাল ভরাটে বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর যেমন দায় আছে, সরকারি সংস্থাসমূহও এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শহরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ধ্বংস করছে। ড্রেনেজ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর যথাযথ সময়ে বাস্তবায়ন না করে প্রকল্প ব্যয় ও সময় বাড়ানোর প্রবণতা রয়েছে। নগর পরিকল্পনা ও পানি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত নগর সংস্থাসমূহের মধ্যে আন্তঃসমন্বয়ের অভাব এবং সমন্বয়হীন বিভিন্ন ড্রেনেজ প্রকল্প ও উদ্যোগ বাস্তবায়নে জলাবদ্ধতার প্রকোপ বাড়ছে। খাল ও ড্রেনগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে, এ ধরণের রক্ষণাবেক্ষনে এলাকাবাসীর সম্পৃক্ততা নেই। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং প্লাষ্টিক-পলিথিন এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে ড্রেনেজ সিস্টেম এর কার্যকারিতা বহুলাংশে হ্রাসও জলাবদ্ধতার কারণ।

আইপিডির পক্ষ থেকে আরো বলা হয়, নগর পরিকল্পনার মৌলিক কাঠামো ধ্বংস করে দিয়ে নগর উন্নয়ন হচ্ছে। নগর এলাকায় ১০-১৫ ভাগ জলাশয়-জলাধার; ২৫ ভাগ সবুজ এলাকা সংরক্ষণের মৌলিক বাধ্যবাধকতা উপেক্ষা করেই নগর উন্নয়ন ও স¤প্রসারণ জলাবদ্ধতার মূল কারণ। এমনকি নগর এলাকার স¤প্রসারণের সময় জলাধার এলাকা ও বন্যা প্রবাহ এলাকার ভরাট ও নগরায়নের কারণে বৃষ্টি পানি নেমে যাবার জায়গাগুলোর সংকোচনে নগরে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, উপেক্ষিত হচ্ছে মহাপরিকল্পনার কার্যকর বাস্তবায়ন। পরিবেশ, জলাধার সংরক্ষণ, ইমারত নির্মাণ ও নগর উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট আইনগুলোর কার্যকর প্রয়োগের অভাব রয়েছে। খাল-জলাধার-নদী দখলদারদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কাছে আইনের শাসনের অকার্যকার হয়ে পড়েছে।

সংলাপে আইপিডি’র উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ বলেন, ১৯৯৫ সালে ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান হবার পরেও গত দুই দশকে চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে চট্টগ্রামের নগর সেবা সংস্থাসমুহের নির্লিপ্ততা একেবারেই অমার্জনীয়। জলাবদ্ধতা দূরীকরণে সরকারি সংস্থাসমুহের বর্তমান আগ্রহ কেবল ব্যয়বহুল প্রকল্প আনবার প্রতিযোগিতা। পাশাপাশি আমাদের নাগরিকদের ও বর্জ্য ফেলবার ব্যাপারে দায়িত্ববোধের অভাব রয়েছে। তদুপরি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা টেকসই করবার সাথে সাথে জনগণকে সম্পৃক্ত করতে সরকারের যথাযথ ভ‚মিকা পালন করা দরকার। আগামী দিনের জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত চিন্তা করেই ভ‚মি ব্যবহার এর সাথে সমন্বয় করে ড্রেনেজ পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা দরকার। আইপিডি পরিচালক পরিকল্পনাবিদ মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম বলেন, নগর এলাকার ভ‚মির বৈশিষ্ট্য ও বন্ধুরতা আমলে না নিয়েই নগর উন্নয়ন করবার কারণেই বাংলাদেশের শহর এলাকায় জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করছে। ময়মনসিংহ শহরের দূর্যোগ সহনশীল মহা পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হলেও জলাবদ্ধতা দূরীকরণে এই পরিকল্পনাকে কাজে না লাগিয়ে খেয়ালখুশিমত নালা-নর্দমা নির্মাণ করা হচ্ছে, ফলে জলাবদ্ধতা কমছে না। শহর এলাকার জনঘনত্ব ও ডিজাইন পপুলেশন ঠিক না করতে পারবার কারণে পরিবেশ ধ্বংস হবার পাশাপাশি ড্রেনেজ পরিকল্পনা অকার্যকর হয়ে পড়ছে।

এতে আরো বক্তব্য রাখেন নগর পরিকল্পনাবিদ হিশামউদ্দিন চিশতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফরহাদুর রেজা, চট্টগ্রাম বিআইপি চ্যাপ্টার এর সাবেক সাধারণ সম্পাদক এটিএম শাহজাহান প্রমূখ ।

Facebook Comments Box